দেশী ব্র্যান্ড তৈরির স্বপ্নে নতুন মাইলফলক ৫০তম বাজেট

সিনিউজ ডেস্ক : স্বাধীনতার সূবর্ণ জয়ন্তীতে দেশীয় শিল্পের বিকাশ, কর্মসংস্থান ও বাংলাদেশি ব্র্যান্ড তৈরির স্বপ্ন সুসংহত করবে এবারের ৫০ তম বাজেট। ২০২১-২২ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে দেশীয় শিল্পের জন্য বিভিন্ন নীতি সহায়তা দেশি ব্র্যান্ড তৈরীর অগ্রযাত্রার পথে নতুন মাইলফলক হিসেবে কাজ করবে বলে মনে করছেন ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই-এর সহ-সভাপতি ও মিনিস্টার গ্রুপের চেয়ারম্যান এম এ রাজ্জাক খান রাজ। বাজেট প্রতিক্রিয়ায় তিনি বলেন, স্থানীয় শিল্পের জন্য বিভিন্ন কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক কমানোয় গৃহস্থালি কাজে ব্যবহৃত ফ্রিজ, এসি, ব্লেন্ডারসহ বিভিন্ন ইলেকট্রনিক শিল্পের বিকাশ ঘটবে। একইসঙ্গে এসব পণ্যের দাম কমার সাথে সাথে মানও ভালো হবে বলে মনে করছেন এই ব্যবসায়ী নেতা।

তিনি বলেন, নতুন বাজেট দেশীয় শিল্প ও ব্যবসাবান্ধব হলেও এ ক্ষেত্রে প্রয়োজন নীতির ধারাবাহিকতা এবং দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা। তবে প্রস্তাবিত বাজেটে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক নিরাপত্তা, অবকাঠামো, আইনশৃঙ্খলা, কর্মসংস্থান ইত্যাদি খাতে গত অর্থবছরের চেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কিন্ত দেশীয় শিল্প বিকাশের জন্য ইলেকট্রনিক্স ও ইলেকট্রিক্যাল পণ্য উৎপাদনকারী শিল্প, ওষুধ শিল্প, কৃষি যন্ত্রপাতি উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান, লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং, কম্পিউটার সামগ্রী উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান, খেলনা উৎপাদন, হাঁস-মুরগি মাছের খাবার উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান, স্যানিটারি ন্যাপকিন অর্ডার উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানসহ নানান শিল্পের জন্য বিভিন্ন ধরনের সুযোগ-সুবিধা বেড়েছে। এতে দেশের জিডিপির প্রবৃদ্ধির গতিও বাড়বে বলে মনে করেন তিনি।

জানা যায়, এবারের বাজেটে শিল্পের ১৯টি খাতে কর অবকাশ সুবিধা থাকছে। তার মধ্যে শিল্পের কাঁচামাল আমদানির ক্ষেত্রে আগাম কর (এআইটি) এক শতাংশ কমিয়ে ৩ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। এছাড়া এলপিজি সিলিন্ডার, ফ্রিজার, রেফ্রিজারেটর ও এর কম্প্রেসারের উৎপাদনের ক্ষেত্রে বিদ্যমান ভ্যাট অব্যাহতি সুবিধা আরও এক বছর বাড়ানো হয়েছে। এছাড়া এয়ারকন্ডিশনার ও এর কম্প্রেসার, মোটর কার ও মোটর ভেহিক্যাল উৎপাদনেও বিদ্যমান সুবিধা বহাল রাখা হয়েছে। তাছাড়া দেশীয় গৃহস্থালি কাজের জন্য দৈনন্দিন ব্যবহার্য পণ্য বিশেষ করে ব্লেন্ডার, জুসার, মিক্সার, গ্রাইন্ডার, ইলেকট্রনিক কেটলি, রাইস কুকার, মাল্টি কুকার পেসার কুকারে স্থানীয় উৎপাদন পর্যায়ে ভ্যাট ছাড় দেয়া হয়েছে। একই সুবিধা দেওয়া হয়েছে ওয়াশিং মেশিন, মাইক্রোওয়েভ ওভেন, ইলেকট্রনিক ওভেনের স্থানীয় উৎপাদন পর্যায়ে।

দেখা যায়, ভারতসহ পৃথিবীর অনেক দেশে কর্পোরেট কর হার কম এবং কর কাঠামো সহজ। ভারতে কর্পোরেট কর হার দুটি। বড় কোম্পানির জন্য ৩০ শতাংশ এবং স্থানীয় কোম্পানির ক্ষেত্রে ২৬ শতাংশ। শ্রীলঙ্কা ও পাকিস্তানে কর্পোরেট কর হার যথাক্রমে ২৮ ও ৩০ শতাংশ। সিঙ্গাপুরে একটিমাত্র কর্পোরেট কর হার এবং তা মাত্র ১৩ শতাংশ। এটা বিবেচনা করেই সরকার এবারের বাজেটে ব্যবসায়ীদের সুযোগ-সুবিধা দিচ্ছে বলে ধারণা করছে অনেকেই।

বর্তমানে দেশের উদীয়মান শিল্প হচ্ছে ইলেক্ট্রনিক শিল্প। এ শিল্প বর্তমানে দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশেও পণ্য রপ্তানি করছে। ফলে এ শিল্পকে আরও চাঙ্গা রাখতে ফ্রিজ, টেলিভিশন, এয়ারকন্ডিশনসহ এসব পণ্য দেশীয় ইলেক্ট্রনিক্স শিল্প মূল্য সংযোজন কর বা ভ্যাট অব্যাহতি সুবিধা দিচ্ছে। এতে এসব খাতে উৎপাদিত পণ্যের বিপরীতে ১৫ শতাংশ ভ্যাট দিতে হবে না। আবার যারা এসব কারখানা স্থানীয়ভাবে স্থাপন করবেন, তাদের জন্য ১০ শতাংশ কর অবকাশ সুবিধা (ট্যাক্স হলিডে) দেয়ার প্রস্তাব রয়েছে এ বাজেটে।

এদিকে, ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেটে সরকারি তালিকাভূক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর কর ২৫ শতাংশ হতে ২২.৫ শতাংশ, নন-তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে ৩২.৫ শতাংশ হতে ৩০ শতাংশ এবং মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের কর ব্যাংকের মতো করার মাধ্যমে শিল্প খাতকে আরও সম্প্রসারিত করতে সরকার যে শিল্পবান্ধব বাজেট নিয়ে এসেছে তার জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তাফা কামালকে ধন্যবাদ জানিয়ে এফবিসিসিআই-এর সহ-সভাপতি বলেন, অর্থনীতিতে বড় অবদান রাখবে দেশীয় শিল্পখাত। কারণ দেশীয় শিল্প ঘুরে দাঁড়ালে ব্যাপক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড তৈরি হবে—কর্মসংস্থান বাড়বে—উদ্যোক্তা তৈরি হবে।

তিনি আরও বলেন, আমদানীকৃত কাঁচামালের ক্ষেত্রে ভ্যাট ও ট্যাক্সের জটিলতা নিরসণের পাশাপাশি স্থানীয় টিভি উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো এলইডি টিভি উৎপাদনকারী হিসাবে আমদানী পর্যায়ে ১০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক প্রদান করে পণ্য খালাস করায় প্রতিযোগিতামূলক বাজারে টিকে থাকতে পারছে না। ফলে একদিকে যেমন মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রা দেশের বাইরে চলে যাচ্ছে, অন্যদিকে একইভাবে দেশীয় শিল্পোন্নয়ন ও কর্মসংস্থান বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এজন্য সম্পূরক শুল্ক ১০ শতাংশ এর পরিবর্তে ২৫ শতাংশ এবং প্রতি কেজি ১৩ ডলার থেকে ২৩ ডলার বৃদ্ধি করা প্রয়োজন।

করোনাকালের বাজেট শিল্পবান্ধব হওয়ায় দেশীয় শিল্প খাতের সাথে যারা জড়িত তারা ব্যাপক সুবিধা পাবে এবং মার্কেটেরও প্রসার হবে। কিন্তু এই শিল্পগুলোকে শুধু দেশের ভেতরে না রেখে বিশ্ববাজারে নিয়ে যেতে হবে। বাংলাদেশি পণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে নীতি সহায়তা দেয়ার তাগিদও জানিয়েছেন এফবিসিসিআই-এর সহ-সভাপতি। এক্ষেত্রে তিনি পণ্য রপ্তানিতে নগদ সহায়তার পরিমাণ বাড়ানোর প্রস্তাব করেন।