২০১৯-এ প্রযুক্তিবিশ্বের হালচালে ফাইভজি নেটওয়ার্ক

বেশ কিছুদিন ধরেই ফাইভজি (৫জি)) নেটওয়ার্ক নিয়ে প্রচুর কথাবার্তা চলছে। তবে অনেকেই মনে করেন, ২০১৯ সালই হবে ফাইভজি-র জন্য সেরা সময়। কয়েকটি ফোন নির্মাতা প্রতিষ্ঠান এ বছরের শেস নাগাদ ফাইভজি রেডি ডিভাইস বাজারে আনার ঘোষনা দিয়েছে এবং একইসাথে পাশ্চাত্যের কয়েকবটি শহরও ফাইভজি নেটওয়ার্ক তৈরি করে ফেলবে। তবে তারপরও এটি বলা যায় যে, ফাইভজি পুরোপুরিভাবে কার্যকর হতে হতে আগামী কয়েক বছর লেগে যাবে। শুরুতে হাতে গোনা ককেটি শহরই কেবল এই অতি দ্রুত মোবাইল টেকনোলজি ব্যবহারের সুযোগ পাবে এবং এর সঙ্গে যুক্ত হতে হলে মোবাইল ইউজারদের তাদের ফোনকে আপগ্রেড করতে হবে। ফাইভজি প্রযুক্তির বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, এই নেটওয়ার্ক প্রচুর পরিমাণে ডাটা হ্যান্ডল করতে পারবে এবং একইসাথে একাধিক ডিভাইসকে সংযুক্ত করতে পারবে- আর এসবই করা সম্ভব হবে বিদ্যমান প্রযুক্তির তুলনায় অনেক দ্রুতগতিতে। বর্তমান ফোরজি নেটওয়ার্ক যেখানে সর্বোচ্চ ৫০ এমবিপিএস গতিতে ডাউনলোড করে, ফাইভজি সেখানে ডাউনলোড করতে পারবে এর তুলনায় ১০০ গুণ বেশি গতিতে। তত্ত্বগতভাবে, এর মানে হচ্ছে , আপনি কোনোরকম ল্যাগ ছাড়াই আপনার মোবাইলে একটি ৪কে ভিডিও স্ট্রিমিং করতে পারবেন। ফাইভজি একইসাথে অনেকগুলো ডিভাইস নিয়ে কাজ করতে পারে, যার মানে হচ্ছে , স্মার্ট ভবন ও স্মার্ট শহরে একাধিক ইন্টারনেট অব থিংস ডিভাইসের সাথে সংযুক্ত হওয়ার সুযোগ।

বর্তমানে ব্যবহৃত সবগুলো মোবাইল নেটওয়ার্ক বেতার তরঙ্গ ব্যবহার করে, কিন্তু ফাইভজির গতি দ্রুত কারণ এটি ইলেকট্রোম্যাগনেটিক স্পেকট্রামের এমন বিট ব্যবহার করে যেগুলো বর্তমানে অন্য কোনো নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে না। রিসিভার ও ট্রান্সমিটার টেকনোলজিতে নতুন কিছু উদ্ভাবনের সুবাদে ফাইভজি নেটওয়ার্ক অত্যন্ত উঁচু ও অত্যন্ত নিম্ন ফ্রিকোয়েন্সি ওয়েভ ব্যবহার করতে পারে যা বিদ্যমান প্রযুক্তি দিয়ে ব্যবহার করা অসম্ভব ছিল। আর এ কারণে ফাইভজি-র ক্ষেত্রে দ্রুত বেশ কিছু পরিবর্তন ঘটে চলেছে। ডিসেম্বর ২০১৮-তে কোয়ালকম তাদের স্ন্যাপড্রাগন ৮৫৫ সিপিইউ অবমুক্ত করেছে যাতে আছে এক্স৫০৫জি মোডেম এবং যেটি ২০১৯-এ অনেকগুলো ফাইভজি-রেডি স্মার্টফোনে ব্যবহৃত হবে। ভেরাইজন ও এটিএন্ডটি উভয়েই স্যামসাং-এর সাথে মিলে ফাইভজি রেডি ফোন তৈরির ঘোষণা দিয়েছে। অন্যদিকে ওয়ানপ্লাস জানিয়েছে, ফাইভজি-রেডি স্ন্যাপড্রাগন ৮৫৫ প্রসেসর দিয়ে তৈরি সর্বপ্রথম ফোনগুলোর একটি তৈরি করছে তারা। এদিকে এলজি জানিয়েছে, তারাও নিজেদের স্প্রিন্ট এক্সক্লুসিভ সিপিইউ দিয়ে তৈরি ফাইভজি-রেডি ফোন বাজারে আনবে। অ্যাপল নাকি ফাইভজি স্মার্টফোন বাজারে আনতে ২০২০ পর্যন্ত সময় নেবে। বস্তুত কোম্পানিটি ফাইভজি নেটওয়ার্ক পুরোপুরিভাবে ছড়িয়ে পড়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে চায়। ওয়্যারলেস কানেক্টিভিটির নিয়মকানুন তৈরি করে যে সংস্থাটি তার নাম -দি থার্ড জেনারেশন পার্টনাশীপ প্রোজেক্ট । তারা ২০১৭-এর শেষের দিকে ফাইভজি-র প্রথম স্পেসিফিকেশনটি তৈরি করে। নন-স্ট্র্যান্ডঅ্যালোন স্পেসিফিকেশন অব ফাইভজি নিউ রেডিও স্ট্যান্ডার্ডটি ৬০০ ও ৭০০ মেগাহার্টজ ব্যান্ড এবং স্পেকট্রামের ৫০ গিগাহার্টজ মিলিমিটার ওয়েভ প্রান্ত কাভার করে।

২০১৯-এ প্রযুক্তিবিশ্বের হালচালে ফাইভজি নেটওয়ার্ক

থার্ড জেনারেশন পার্টনারশিপ প্রজেক্টের এই ঘোষণার ফলে ফাইভজি মোডেম সংযুক্ত হ্যান্ডসেট তৈরির পথ প্রশস্ত হয়। ২০১৮-এর জুনে উপরোক্ত সংস্থাটি স্ট্যান্ডঅ্যালোন ফাইভজির নিয়ম কানুন তৈরি সম্পন্ন করে। নেটওয়ার্ক অপারেটররা এখন নতুন এই স্ট্যান্ডার্ডের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ এমন ইকুইপমেন্ট ব্যবহারের মাধ্যমে তাদের সফটওয়্যারগুলোকে আরো নিখুঁত করে তুলতে পারবে। আগের বিভিন্ন জেনারেশনের সাথে তুলনা করলে ফাইভজি-র লঞ্চিং হবে সম্পূর্ণ ভিন্ন রকমের। Sub-6GHz, mmWave এবং NB-IoT-এর মতো কয়েকটি ওয়্যারলেস টেকনোলজির অন্তর্ভুক্তির সুবাদে ফাইভজি-এর জন্য তৈরি অ্যাপ্লিকেশনগুলো আগের জেনারেশনগুলোর তুলনায় অনেক বেশি ব্যাপক হবে। এর ফলে কেবল ডিভাইস OEM নয়, এন্টারপ্রাইজ ও অপারেটরদের জন্যও নতুন সুযোগ নিয়ে আসবে। ফাইভজি-র ভুবনটি ক্রমশই প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হয়ে উঠছে। কেবল বিভিন্ন সেবাদাতা সং স্থাই নয়, দেশে দেশেও এ নিয়ে প্রতিযোগিতা শুরু হবে। এক বছরেই বিশ্বের প্রায় সব অঞ্চলে এটি একযোগে লঞ্চ করার কথা। আগের জেনারেশনগুলোর মতোই প্রথমে বড় বড় শহরগুলোতে এর যাত্রা শুরু হবে এবং পরিপূর্ণ জাতীয় ও বৈশ্বিক কাভারেজের জন্য কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে। টিরিয়াস রির্সাচ নামে একটি গবেষণা সং স্থা মনে করে, এর প্রসার ফোরজি-র তুলনায় দ্বিগুণ দ্রুত হবে। উল্লেখ্য, বৈশ্বিক কাভারেজে পৌঁছাতে ফোরজি-র দশ বছরের মতো সময় লেগেছিল। ফাইভজি-র এই দ্রুত লঞ্চিং নেটওয়ার্কিং ভুবনের দ্রুত পরিপক্বতারই ইঙ্গিত দেয়। এটি যদিও 4G LTE নেটওয়ার্কের মতোই একই OFDM  প্রযুক্তির ওপর ভিত্তি করেই প্রতিষ্ঠিত, তারপরও এর তুলনা আরো বেশি লাইসেন্সড ও আনলাইসেন্সড ফ্রিকোয়েন্সি ব্যান্ড-এর ব্যবহারের কারণে এতে অন্তর্নিহিত অনেক জটিলতা আছে। কোয়ালকম ইঙ্গিত দিয়েছে যে, এতে সম্ভাব্য ফ্রিকোয়েন্সি ব্যান্ডের সংখ্যা ১০ হাজার ছাড়িয়ে যেতে পারে, যা ফোরজির তুলনায় দশ গুণ বেশি। যাই হোক, এরিকসন, ডিটি মোবাইল, হুয়াওয়েই, নকিয়া, স্যামসাং ও জেডটিই-র মতো প্রধান প্রধান সব টেলিকমিউনিকেশন ভেন্ডরের পূর্ণাঙ্গ সমর্থন থাকার কারণে এসব জটিলতার নিরসন ঘটানো খুব একটা কঠিন হবে না বলেই বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।

–সিনিউজভয়েস/

 

Please Share This Post.