হুয়াওয়ে-যুক্তরাষ্ট্র দ্বৈরথ: কে জিতবে?

চীনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের চলমান বাণিজ্য যুদ্ধের অংশ হিসেবে চীনা টেকনোলজি জায়ান্ট হুয়াওয়ে-এর বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। দিনদিন সমস্যা আরো ঘনীভূত হচ্ছে। হুয়াওয়েইর সংকটও ক্রমশ বেড়ে চলেছে। ইতোমধ্যে গুগল ও আর্ম (ARM)-এর মতো প্রতিষ্ঠানও হুয়াওয়েইর সাথে কাজ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররাষ্ট্রগুলোর অভিযোগ হচ্ছে, হুয়াওয়ে চীনা সরকারের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত এবং তারা মেধাস্বত্ত্ব লঙ্ঘন ও গুপ্তচরবৃত্তির মতো অপরাধে লিপ্ত। এ কারণে হুয়াওয়ে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বড় ধরনের নিরাপত্তা হুমকির সৃষ্টি করেছে। হুয়াওয়ে বরাবরই এসব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে।

হুয়াওয়ে-র প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এমনও বলেছেন, চীনা সরকার যদি তাদের হয়ে হুয়াওয়েইকে গুপ্তচরবৃত্তি করতে বলে তবে সেটি মানার পরিবর্তে তিনি বরং কোম্পানিকে বন্ধ করে দেবেন। এদিকে সমস্যা হচ্ছে ফাইভ জি নেটওয়ার্কের বিস্তারে হুয়াওয়ে বৈশ্বিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। ফলে ফাইভ জি নেটওয়ার্ক সারাবিশ্বে ছড়িয়ে পড়ার সাথে সাথে এটি হুয়াওয়েকে (এবং, যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগমতে, চীনা সরকারকেও) এই নেটওয়ার্কের ওপর কর্তৃত্ব করার সুযোগ করে দেবে। হুয়াওয়েইর হ্যান্ডহেল্ড ডিভাইসগুলো স্পাইওয়্যারের মাধ্যমে সারা পৃথিবীতে নজরদারির কাজে ব্যবহৃত হবে বলে মার্কিন সরকারের আশঙ্কা।

মার্কিন সরকারের চাপে সম্প্রতি গুগল হুয়াওয়ের অ্যান্ড্রয়েড ব্যবহারের লাইসেন্স প্রত্যাহার করে নিয়েছে। এর মানে হচ্ছে, গুগল সার্চ, ইউটিউব ও জিমেইলের মতো প্রোপ্রাইটরি অ্যাপস ও সেবাগুলো ভবিষ্যতে হুয়াওয়ের ডিভাইসে কাজ করবে না। এছাড়া হুয়াওয়েইর স্মার্টফোন ব্যবহার করে গুগল প্লেস্টোরে ঢোকাও যাবেনা। নিঃসন্দেহে এটি হুয়াওয়ের জন্য বিশাল একটি আঘাত হবে। মার্কিন কোম্পানি হিসেবে গুগল স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে, তারা স্রেফ তাদের সরকারের নির্দেশনা মেনে চলতে বাধ্য।

হুয়াওয়ে অবশ্য তারপরও অ্যান্ড্রয়েড অপারেটিং সিস্টেম ব্যবহার করতে পারবে, তবে শুধুমাত্র অ্যান্ড্রয়েড ওপেন সোর্স প্রোগ্রাম (AOSP)-এর মাধ্যমে। তবে এর মাধ্যমে গুগল ক্রোম ও জিমেইলের মতো সেবাগুলো ব্যবহার করা সম্ভব নয়। অন্যদিকে বৃটেনভিত্তিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান আর্ম-ও হুয়াওয়ে-র বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞায় অংশ নিয়েছে।

উল্লেখ্য, আর্ম ইন্টেলের বহুলব্যবহৃত এক্স৮৬ সেমিকন্ডাক্টর আর্কিটেকচারের একমাত্র বিকল্প প্রদান করে। সারা বিশ্বে সেলফোনে তাদের প্রযুক্তি ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। ইন্টেল, কোয়ালকম, ব্রডকম ইত্যাদি কোম্পানিও সামনে একই পথে হাঁটবে। এর মানে হচ্ছে, ভবিষ্যতে হুয়াওয়ের বিপদ বাড়বে বই কমবে না। জানা গেছে, মার্কিন বাজারে ঢোকার পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় হুয়াওয়েই এখন তাদের নিজেদের চিপ নির্মাণের সামর্থ্যকে বাড়ানোর চেষ্টা করছে- কিন্তু আর্ম-এর লাইসেন্স না পেলে এটি করাও তাদের পক্ষে কঠিন হয়ে যাবে। অবশ্য গুগলসহ যেসব আমেরিকান কোম্পানি হুয়াওয়ের সাথে ব্যবসা করে সেটি বন্ধ করা এবং হুয়াওয়ের বিকল্প খুঁজে বের করার জন্য মার্কিন বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এসব কোম্পানিকে ৯০ দিন সময় দিয়েছে।
ফেসবুকও সম্প্রতি উদ্যোগ নিয়েছে হুয়াওয়ের স্মার্টফোনে ফেসবুক অ্যাপ যাতে আগে থেকে ইনস্টল করা হবে না বলে ঘোষণা দিয়েছে।

ফেসবুকের প্রধান অ্যাপ, এছাড়াও তাদের সাবসিডিয়ারি কোম্পানি হোয়াটসঅ্যাট ও ইনস্টাগ্রামও যাতে হুয়াওয়ের ফোনে বিল্ট-ইন অবস্থায় না আসে সে ব্যাপারেও পদক্ষেপ নেবে তারা। গেল মে মাসে যুক্তরাষ্ট্র সরকার আমেরিকান কোম্পানিগুলোকে নিষেধ করে দেয় হুয়াওয়ের সাথে কোনো ধরনের সহযোগিতা না করতে। কারণ আমেরিকান সরকার হুয়াওয়েইকে নিরাপত্তার দিক থেকে ঝুঁকিপূর্ণ বলে মনে করে। যেসব ব্যক্তি ইতোমধ্যে হুয়াওয়েই ফোন কিনেছেন এবং ফেসবুকসহ এসব অ্যাপ তাদের ফোনে আছে তারা অবশ্য এগুলোর ব্যবহার চালিয়ে যেতে পারবেন। এছাড়ও হুয়াওয়েই ফোনে ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ ও ইনস্টাগ্রামের যেসব ভারসন আছে সেগুলোর আপডেটও তারা জুগিয়ে যাবে বলে আশ্বস্ত করেছে ফেসবুক। ফেসবুকের এই সিদ্ধান্তের বিষয়ে হুয়াওয়েই এখন পর্যন্ত কোনো ধরনের মন্তব্য করেনি। এই সিদ্ধান্ত কেবল প্রি-ইনস্টলড অ্যাপের ক্ষেত্রে কার্যকর এবং হুয়াওয়েই ফোনের মালিকেরা তাদের ফোনে এসব অ্যাপ ডাউনলোড ও ইনস্টল করতে পারবেন কোনো সমস্যা ছাড়াই। তবে ভবিষ্যতে গুগল যদি তাদের প্লেস্টোরে হুয়াওয়েই ফোন থেকে অ্যাকসেস নেয়া বন্ধ করে তাহলে কি- এসব অ্যাপ মানুষ ইনস্টল করতে পারবে না।

প্রতিকূল এই পরিস্থিতে হুয়াওয়েই গুগলের অ্যান্ড্রয়েড-এর সাথে প্রতিযোগিতা করার জন্য নিজস্ব একটি অপারেটিং সিস্টেম বানিয়েছে এবং তার নাম দিয়েছে হংমেং। মার্কিন বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞার কারণে হুয়াওয়েইর সাথে আমেরিকান প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যবসা-বাণিজ্যে নিষেধাজ্ঞার পাল্টা হিসেবেই এটি তৈরি করেছে হুয়াওয়ে। বলা হচ্ছে, হংমেং নামের এই ওএসটি অ্যান্ড্রয়েড-এর মতোই হবে, যাতে করে ব্যবহারকারীরা সহজেই একটি থেকে আরেকটিতে স্নানান্তরিত হতে পারেন। হুয়াওয়ে চীনে হংমেং-এর নামে পেটেন্ট রেজিস্ট্রেশন করিয়েছে যার মেয়াদ ২০২৯-এর মে মাস পর্যন্ত চালু থাকবে।

অন্যদিকে ইউরোপের বাজারের জন্য হুয়াওয়ে আর্ক অপারেটিং সিস্টেম নামেও একটি পেটেন্ট রেজিস্ট্রেশন করিয়েছে তারা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হুয়াওয়ে-র অন্যতম শক্তি হচ্ছে, গুরুত্বপূর্ণ অনেক প্রযুক্তির ওপর বিশ্বজুড়ে বিপুল পরিমাণে পেটেন্ট করা আছে তাদের। অনেকেই জানেন না, টেলিকমিউনিকেশন, নেটওয়ার্কিং ও অন্যান্য হাই-টেক উদ্ভাবনের ওপর হুয়াওয়ের মোট ৫৬ হাজার ৪৯২টি পেটেন্ট করা আছে। যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে তাদের প্রবেশাধিকার সীমিত হয়ে আসার সাথে সাথে তারা রয়্যালটি ও লাইসেন্সিং ফি দাবি করার মাধ্যমে নিজেদের ক্ষতি পুরিয়ে নেয়া চেষ্টা করবে।

কেবল হুয়াওয়েকে কেন্দ্র করেই নয়, সামগ্রিকভাবেই চীন-মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান বাণিজ্য যুদ্ধ ক্রমেই আরো উত্তপ্ত হয়ে উঠছে। উভয় দেশ একে অন্যের পণ্যের ওপর কর আরোপ অব্যাহত রেখেছে। চীন মাকির্ন যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে দুষ্প্রাপ্য খনিজ রপ্তানি বন্ধ করে দেয়ার হুমকি দিয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের সয়াবিন কেনাও বন্ধ করে দিয়েছে বলেও অসমর্থিত সূত্রে জানা গেছে। এদিকে হুয়াওয়ে-র ওপর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প-এর নিষেধাজ্ঞাকে ‘হত্যকান্ড’ বলে আখ্যা দিয়েছেন ইউএস-চায়না বিজনেস কাউন্সিল। কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট ক্রেইগ অ্যালেন বলেন-‘আমরা যদি হুয়াওয়েকে আমাদের নেটওয়ার্কের বাইরে রাখতে চাই তাহলে সেটা খুব কঠিন কাজ নয়। তাদের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলেই হয়। কিন্তু আমেরিকান কোম্পানিগুলোকে তাদের সাথে ব্যবসা করার ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করাটাকে হত্যাকান্ডের সাথে তুলনা করা যায়।

উল্লেখ্য, ইউএস-চায়না বিজনেস কাউন্সিল চীনের সাথে ব্যবসা করে এমন প্রায় দুইশো কোম্পানির প্রতিনিধিত্ব করে। অ্যালেন আরো বলেন, ‘কোনো আগন্তক যদি আপনার বাড়ির দরজায় টোকা দেয় তাহলে আপনি তাকে ঢুকতে দিতে না পারেন। কিন্তু বন্দুক দিয়ে তাকে গুলি করার অধিকার আপনাকে কে দিয়েছে?

-সিনিউজভয়েস/ডেক্স

 

 

Please Share This Post.