সোনিয়া বশির কবির: তথ্যপ্রযুক্তি খাতের উজ্বল নক্ষত্র

অর্থনীতি, শিল্প, কৃষি, স্বাস্থ্য ও প্রযুক্তির উন্নয়নে বাংলাদেশ যেভাবে নিম্ন থেকে মধ্যম আয়ের দেশে উন্নতি লাভ করেছে। এভাবে এগিয়ে যাওয়ার মাধ্যমে আরো নতুন নতুন কর্মক্ষেত্র সৃষ্টি করে সব মানুষের জন্য কর্মসংস্থানের সমান সুযোগ নিশ্চিত করা। পাশাপাশি প্রযুক্তির যথাযথ ব্যবহারের মাধ্যমে নাগরিক সুযোগ সুবিধা জনসাধারণের কাছে সহজ সাধ্য করা জনজীবনকে আরো গতিশীল করাই হবে মূল দায়িত্ব।

নতুন নতুন প্রযুক্তির সঠিক প্রয়োগ ও ব্যবহারে জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে মানুষের জীবন ধারাকে উন্নত করাই হচ্ছে এদেশের তথ্য প্রযুক্তিবিদ ও নীতি নির্ধারকদের মূল চ্যালেঞ্জ। প্রযুক্তি জানা মায়েরাও তাদের সন্তানদেরকে আগামীদিনের দিক নির্দেশনা দিতে পারবে। জনসাধারনকে অনেকগুলো চ্যালেঞ্জের মোকাবিলা করতে হবে আর সে সব চ্যালেঞ্জ এর জন্য যে সকল প্রস্তুতি দরকার সেটা সরকারের সাথে দেশী- বিদেশী সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।

তথ্যপ্রযুক্তি খাতের এক বাংলাদেশি উজ্বল নক্ষত্র সোনিয়া বশির কবির। যিনি দেশের গন্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়েও নানা স্বীকৃতি বয়ে এনেছেন দেশের জন্য। তিনি ফাইন্যান্সিয়াল টেকনোলজি প্রতিষ্ঠান ডি-মানি ও ‘বাংলাদেশ উইমেন ইন টেকনোলজি’র সহ-প্রতিষ্ঠাতা এবং ভাইস প্রেসিডেন্ট, সহ-প্রতিষ্ঠাতা সিনটেক বাংলাদেশের। শুধু তাই নয়, ইউনাইটেড নেশন টেক ব্যাংকের ভাইস চেয়ারম্যান, কাজ করেছেন মাইক্রোসফট বাংলাদেশ, নেপাল, ভুটান, লাওস আর মিয়ানমারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং ডেল বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর হিসেবেও কাজ করেছেন।

যে ক’জন কীর্তিমান বাংলাদেশি বিশ্ব দরবারে নিজেদেরকে বিশেষভাবে চেনাতে পেরেছেন, সোনিয়া বশির কবির তাদেরই একজন। তাঁর অনন্যতা এই যে, তিনি নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেছেন দেশের বাইরে থেকে নয়, বরং দেশের এই ট্রাফিক জ্যাম আর হৈ-হট্টগোলের মাঝে কাজ করেই। তাকে নিয়ে উচ্ছ্বসিত হওয়াই যায়, বিশেষত তার কর্মজীবনের বিস্তৃতি জানার পর।

তিনি ১৯৯৯-২০০৫ সাল পর্যন্ত ক্যালিফোর্নিয়াভিত্তিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ‘সান মাইক্রোসিস্টেমস’-এর অর্থ নিয়ন্ত্রক (ফাইন্যান্স কন্ট্রোলার) হিসেবে কাজ করেন। ২০০৭ সালের শেষ দিকে প্রধান অপারেটিং অফিসার হিসেবে যোগ দেন ঢাকাকেন্দ্রিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ‘আমরা টেকনোলজিস লিমিটিড’-এ। সেখানে কাজ করেছে আড়াই বছর। ২০০৯-১২ সাল পর্যন্ত ‘বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড’ তথা বিসিবির নারী উইংয়ে কাজ করেছেন। ২০১০ সালে যোগ দেন মাইক্রোসফটের দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় উদীয়মান বাজারের ব্যবসায়িক উন্নয়ন কর্মকান্ডের পরিচালক হিসেবে। এখানে কাজ করেন দেড় বছর। ২০১১ সাল থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত প্রায় ৩ বছর কাজ করেছেন ডেল কম্পিউটার্স বাংলাদেশের কান্ট্রি ম্যানেজার হিসেবে। ‘আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল স্কুল ঢাকা’-র বোর্ড অব ডিরেক্টরসের সদস্য ছিলেন ২০০৭-১৫ পর্যন্ত টানা ৮ বছর। তিনি টাই (TiE) ঢাকার প্রতিষ্ঠাতা প্রেসিডেন্ট। ‘বাংলাদেশ উইমেন ইন টেকনোলজি’র সহ-প্রতিষ্ঠাতা এবং ভাইস প্রেসিডেন্ট। ২০১৩ সাল থেকে তিনি এ দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি বাংলাদেশি কম্পিউটার সফটওয়্যার প্রতিষ্ঠান ‘সিনটেক কনসাল্টিং লিমিটেড’এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা। ২০০৬ সাল থেকে বর্তমান অবধি তিনি এই প্রতিষ্ঠানের ভাইস প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করে আসছেন। তিনি ‘ডিমানি বাংলাদেশ’এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা।

তিনি এসকেবি টেক ভেঞ্চার এর প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান ও সিইও, এখন র্পযন্ত ডি-মানি, ডেলিগ্রাম, ডিজিল্যান্ড, প্রাভা হেল্থ, সোলশেয়ার, রোয়ার গ্লোবাল, ট্রন ও প্রিয়শপ এর মতো বেশ কিছু প্রতিষ্ঠানে অর্থায়ন করেছেন। ২০১৬ থেকে তিনি এ প্রতিষ্ঠানের ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। ২০১৪ সাল থেকে টেক জায়ান্ট ‘মাইক্রো সফটবাংলাদেশ’এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক বা এমডি (ম্যানেজিং ডিরেক্টর) হিসেবে নিযুক্ত ছিলেন। পরে ২০১৭ সালের নভেম্বরে নেপাল, ভুটান, মিয়ানমার এবং লাওসের মাইক্রোসফটের এমডির দায়িত্ব পালন করেন এবং ৩০ এপ্রিল ২০১৯ পদত্যাগ। ২০১৬ সাল থেকে বর্তমান পর্যন্ত তিনি স্বল্পোন্নত দেশগুলোর জন্য জাতিসংঘের ‘টেকনোলজি ব্যাংক’ প্রোগ্রামে ভাইস চেয়ারপারসন হিসেবে কর্মরত আছেন। সর্বশেষ ২০১৮ সালের অক্টোবর মাসে জাতিসংঘের ‘মহাত্মা গান্ধী ইনস্টিটিউট অব এডুকেশন ফর পিস অ্যান্ড সাসটেইনেবিলিটি’ বা এমজিআইইপির গভর্নিং কাউন্সিলর হিসেবে নিযুক্ত হয়েছেন।

এছাড়াও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে স্বেচ্ছাশ্রম দিয়ে যাচ্ছেন সোনিয়া বশির কবির। তিনি ‘দ্য ফাউন্ডার ইনস্টিটিউট’-এর মেন্টর হিসেবে কাজ করেছেন কিছুকাল। বর্তমানে যুক্ত আছেন বাংলাদেশের স্বনামধন্য বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ‘নর্থ সাউথ’-এর বাণিজ্য বিভাগের উপদেষ্টা বোর্ডের সদস্য হিসেবে। একই রকম পদে কাজ করছেন ইন্ডিপেনডেন্ট বিশ্ববিদ্যালয়েও। এছাড়াও তরু , জাগো ফাউন্ডেশন আর ‘বাংলাদেশ ইয়ুথ লিডারশিপ সেন্টারেও’ কাজ করেছেন সোনিয়া বশির কবির। দু’চোখে তিনি অসীম স্বপ্নের জাল বুনে চলেন দেশকে প্রযুক্তিতে এগিয়ে নেবার, ধনী-গরীব সর্বস্তরের মানুষের কাছে প্রযুক্তিকে পৌঁছে দেয়ার।

সোনিয়া তাঁর সাফল্যমন্ডিত কর্মজীবনে অসংখ্য পুরস্কার ও সম্মাননা জিতেছেন। তার সাফল্যের মুকুটে সবচেয়ে সম্মানজনক পালকটি আসে ২০১৬ সালে। সে বছর মাইক্রোসফটের ‘ফাউন্ডার্স অ্যাওয়ার্ড’ জেতেন সোনিয়া। তাছাড়া, জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা পূরণে অবদান রাখার জন্য ‘এসডিজি ২০১৭ পায়োনিয়ার্স’ পুরস্কার জেতেন তিনি। নিউইয়র্কে অনুষ্ঠিত ‘ইউনাইটেড ন্যাশনস গ্লোবাল কমপ্যাক্ট লিডারস সামিট’ অনুষ্ঠানে তাকে এই সম্মানে ভূষিত করা হয়। ২০১৫ সালে নারীর ক্ষমতায়নের জন্য বাংলাদেশে ‘অনন্যা টপ ১০ পুরস্কারও জেতেন তিনি। যাতে হাত দিয়েছেন তাতেই সফল হয়েছেন তিনি। সাফল্যের পথে নারী হওয়াটা কোনো বাধা নয়, এটি তিনি প্রমাণ করেছেন বারবার। বাংলাদেশের নারীসমাজ তো বটেই, সমগ্র তরুণ প্রজন্মের কাছেই তিনি তথ্যপ্রযুক্তি খাতের উজ্বল নক্ষত্র।

-সিনিউজভয়েস/জিডিটি/১২সেপ্টেম্বর/১৯ 

Please Share This Post.