সাইবার নিরাপত্তায় সিটিও ফোরামের নতুন সংগঠন ‘আইএসএ’

২৬ ডিসেম্বর দুপুর ৩:৩০ টায় ঢাকা রিপোর্টারস ইউনিটের সাগর রুনি মিলনায়তনে সিটিও ফোরাম বাংলাদেশ আয়োজিত  উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করলো ইনফরমেশন সিকিউরিটি অ্যালায়েন্স (আইএসএ)

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ সরকারের তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগের মাননীয় সচিব শ্যাম সুন্দর শিকদার এবং বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বেসিসের সভাপতি মোস্তফা জব্বার।

অনুষ্ঠানে অতিথি হিসেবে আরো উপস্থিত ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এমইএস বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক মো. হেলাল উদ্দিন আহম্মদ, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এটুআই প্রকল্পের আইটি ম্যানেজার মো. আরিফ এলাহি মানিক, দোহাটেকের চেয়ারম্যান মো. সামসুদ্দোহা, বিডিসিইআরটির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি সুমন আহম্মদ সাবির, বিডিওএসএন এর সাধারণ সম্পাদক মুনির হাসান সহ তথ্যপ্রযুক্তিখাতের নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা।

অনুষ্ঠান পরিচালনায় ছিলেন, সিটিও ফোরাম বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি তপন কান্তি সরকার। অনুষ্ঠানে মূল বক্তব্য পাঠ করেন ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির সাইবার সিকিউরিটি সেন্টারের ডিরেক্টর ড. তৌহিদ ভূইয়া।

স্বাগত বক্তব্যে সিটিও ফোরামের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি তপন কান্তি সরকার বলেন, ‘বিটিআরসির হিসাবে ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বাংলাদেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীরা সংখ্যা ৫৮.৩১ মিলিয়নে পৌঁছেছে। এর সঙ্গে তাল মিলিয়ে পরিবর্তিত হয়েছে ব্যবহারকারীর আচরণ। ফলে বাংলাদেশে প্রায় সব সেক্টরই প্রচেষ্টা চালাচ্ছে সনাতন পদ্ধতির পরির্বতে অত্যাধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ অনলাইন লেনদেনের সুবিধা প্রদান করার। কেননা বর্তমানে ডিজিটাল ট্রান্সফরমেশন এবং এর প্রয়োগিক সফলতায় নিরাপত্তা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। প্রযুক্তির প্রয়োগ বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে নিরাপত্তার ঝুঁকিও বেড়ে যাচ্ছে ক্রমান্বয়ে এবং এ বিষয়কে গুরুত্ব না দিলে ডিজিটালাইজেশন এর সুফল ব্যহত হবে। প্রযুক্তির উন্নয়নের সংগে নিরাপত্তার ঝুঁকি বাড়াটা স্বাভাবিক তাই বলে প্রযুক্তির ব্যবহার সংকীর্নকরণ অসম্ভব, আবার ঝুকিপূর্ণতা ও কাম্য নয়। এক্ষেত্রে সমাধান, সাবধানতা এবং সচেতনতা যার জন্য প্রয়োজন যুগবদ্ধ কর্মকান্ড। দেশে বিছিন্নভাবে বিভিন্ন পর্যায়ে ব্যক্তি বা সাংগঠনিকভাবে নিরাপত্তা বিষয়ে সচেতনতা মূলক কাজ হচ্ছে। এই কর্মকান্ডগুলোকে একীভূত করতে পারলে তার সফলতা অনেকগুণ বেড়ে যাবে। যা এই মুহূর্তে খুবই প্রয়োজন। এই প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে এবং নিরাপত্তা বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্বির আন্দোলনকে জোরদার করার লক্ষেই সিটিও ফোরামের এই পদক্ষেপ।’

আইএসএ-এর লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে কথা বলতে গিয়ে তপনকান্তি সরকার নিমোক্ত বিষয়গুলো উল্লেখ করেন-
* সাইবার সিকিউরিটি বিষয়ে সমাজের সচেতনতা বৃদ্ধি করে নিরাপদে ইন্টারনেট ব্যবহার করতে সহায়তা করা হবে আইএসএ’র অন্যতম লক্ষ্য।

* সাইবার সিকিউরিটির ওপর অপর্যাপ্ত জ্ঞান, দক্ষ জনশক্তির অভাব এবং অপর্যাপ্ত নিরাপত্তা সচেতনতা দূর করণে সরকারি ও বেসরকারি খাতে ইতিমধ্যে যে উদ্যোগগুলো নেয়া হয়েছে এগুলোর মধ্যে সঠিক সমন্বয সাধন করা।
* আইএসএ সাইবার নিরাপত্তা বিধানে আইনগত কার্যক্রম ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন বিষয়ে সরকারসহ ব্যাংক, শিল্প ও অন্যান্য ব্যবসা সংগঠনগুলোকে সমর্থন করবে ও সকলের সঙ্গে কাজ করবে।
* সাইবার সিকিউরিটি অগ্রগতিতে এবং সমস্যা মোকাবেলার জন্য নতুন নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবন এবং সংশ্লিষ্ট গবেষণামূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করা আইএসএ’র প্রধান কাজ।

* আইসিটিতে দক্ষ লোক তৈরি করতে হলে, নিরাপত্তা প্রয়োজনীয়তা এবং এর পরিধি বিবেচনায় সর্তকতা অবলম্বন এবং তা সর্বোত্তম কার্যাভ্যাসে পরিণত করা প্রয়োজন। এর জন্য প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের আয়োজন করবে আইএসএ।
* বিভিন্ন সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনার মাধ্যমে ব্যবহারকারীদের নিয়মিত সাইবার নিরাপত্তা চর্চার প্রতি আগ্রহী করে তুলতে কাজ করবে আইএসএ।
* প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা পণ্য ও সেবার সহজ লভ্যতার লক্ষ্যে আইএসএ নিজস্ব উদ্যোগ নিতে স্থানীয়/ আর্ন্তজাতিক বাজারে নিরাপত্তা পণ্য বিক্রেতাদের মধ্যে তথ্য আদান প্রদানের জন্য সুযোগ তৈরি করবে, যার মাধ্যমে এবং উভয় পক্ষের প্রয়োজনগুলো ভালোভাবে বোঝা সহজতর হবে।

 

মূল বক্তব্যে ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির সাইবার সিকিউরিটি সেন্টারের ডিরেক্টর ড. তৌহিদ ভূইয়া বলেন, ‘অনলাইন সুবিধা ব্যবসার জন্য নতুন সুযোগ সৃষ্টি করে, কিন্তু একই সময়ে সাইবার ঝুঁকির কারণে এটা সে প্রতিষ্ঠানের জন্য বিপুল আর্থিক ক্ষতির কারণও হতে পারে। বাংলাদেশের ডিজিটাল ট্রান্সফরমেশনে সৃষ্ঠ বিভিন্ন সাইবার ঝুঁকি, সাইবার ক্রাইম মোকাবেলায় অপর্যাপ্ত প্রযুক্তির জ্ঞান ও সুশাসনের অপর্যাপ্ত উদ্যোগের কারণে মানুষ ক্রমবর্ধমান সমস্যা মোকাবেলায় যথাযথ ভুমিকা পালন করতে পারছে না। ফলে সাইবার ক্রাইম একটি প্রধান হুমকি হিসেবে আবির্ভূত হতে পারে। মোবাইল ফোন এবং ইন্টারনেটের ক্রমবর্ধমান ব্যবহারের সঙ্গে, বাংলাদেশ সাইবার আক্রমণের সম্ভাবনা আরো বেশি। গত কয়েক বছর ধরে আমরা উচ্চ পর্যায়ে বেশ কিছু সাইবার আক্রমণের ঘটনা প্রত্যক্ষ করেছি। সাইবার অপরাধীরা সহজেই আমাদের নিরাপত্তার বলয় ভেদ করে হাতিয়ে নিচ্ছে সংবেদনশীল জাতীয় তথ্যাদি, আর্থিক তথ্য এমনকি সরিয়ে নিচ্ছে বিপুল অংকের অর্থসম্পদ। সুতরাং নিরাপত্তার বিষয়টিকে আর হালকা করে দেখার সময় আর নেই। আমাদের এখনি এটা মোকাবেলায় সকলে একত্রিত হয়ে কাজ করা প্রয়োজন।’

প্রধান অতিথির বক্তব্যে মাননীয় সচিব শ্যাম সুন্দর শিকদার বলেন, ‘তথ্যপ্রযুক্তি দেশের উন্নয়নের প্রধান হাতিয়ার। দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নে এবং ডিজিটাল বাংলাদেশের প্রয়োগ নিশ্চিতকরণে সরকার বদ্ধপরিকর। সর্বক্ষেত্রে এর প্রয়োগে যে সফলতা এসেছে তা আজ জাতীয় এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। তবে এক্ষেত্রে ব্যবহারিক নিরাপত্তার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ সেইসঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল তথ্যপ্রাপ্তি। প্রয়োজনীয় এবং সঠিক তথ্যের অভাবে সরকারী বাজেট বরাদ্দের সময় সাইবার সিকিউরিটি নিশ্চিতকরণ পরিকল্পনা করা কঠিন হয়ে পড়ে। এক্ষেত্রে প্রয়োজন সঠিক এবং গুণগত সংখ্যাতত্ত্ব। সরকারের পক্ষ থেকে সাইবার সিকিউরিটি নিশ্চিতকরণে বিভিন্ন আইন থাকলেও সময়ের দাবিতে এর পরিবর্তন ও পরিমার্জন প্রয়োজন এবং বাংলাদেশ সরকারের তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগ এক্ষেত্রে কাজ করে যাচ্ছে। সর্বশেষে সচেতনতা বৃদ্ধিতে প্রয়োজন সকলের সম্মনিত প্রচেষ্টা। আমি আনন্দিত যে, সিটিও ফোরাম এমন একটি পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে এবং আমি আশা করব এই অ্যালায়েন্স ডিজিটাল বাংলাদেশ গঠনে নিরাপদ তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিতকরণে তাদের বলিষ্ঠ ভুমিকা রাখতে সক্ষম হবে।’

বেসিসের সভাপতি মোস্তফা জব্বার বলেন, ‘বর্তমান সময় ডিজিঠাল ট্রান্সফরমেশনের যুগ। সাইবার সিকিউরিটি বা তথ্য নিরাপত্তার বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ইন্টারনেট ব্যবহার এবং এর অবাধ বিচরণে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা জরুরি, আর এই প্রয়োজনীয়তা নিশ্চিতকরণে প্রযুক্তিপণ্য-সেবার ব্যবহারের সঙ্গে সঙ্গে প্রয়োজন গণসচেতনতা। নিরাপত্তার নিশ্চিতকরণে বিদেশী পণ্য সেবার ওপর ভরসা কমিয়ে আমরা যদি আমাদের দেশীয় বিশেষজ্ঞ এবং প্রতিষ্ঠানের ওপর ভরসা করতে পারি সেটা হবে আমাদের জন্য কার্যকরী পদক্ষেপ। কেননা আমি বিশ্বাস করি নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে আমাদের দেশের সফটওয়্যার শিল্প এবং ব্যক্তির দক্ষতা বিশ্বের কোনো দেশ থেকে কম নয়। তবে তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারে গণসচেতনতা আগের তুলনায় বাড়লেও প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। এর জন্য প্রয়োজন যুথবদ্ধ আন্দোলন। সেক্ষেত্রে সিটিও ফোরামের এ উদ্যোগ প্রশংসনীয়।’

অনুষ্ঠানে আরো বক্তব্য রাখেন দোহাটেকের চেয়ারম্যান সামসুদ্দোহা, বিডিসিইআরটির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি সুমন আহম্মদ সাবির, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এমইএস বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক মো. হেলাল উদ্দিন আহম্মদ, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এটুআই প্রকল্পের আইটি ম্যানেজার মো. আরিফ এলাহি মানিক।

অনুষ্ঠানের শেষে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন ফোরামের মহাসচিব ড. ইজাজুল হক।

 

– সিনিউজভয়েস ডেস্ক

Please Share This Post.