শিশুদের কেন কোডিং শেখাতে হবে

কাউকে যদি জিজ্ঞেস করেন, একুশ শতকের পৃথিবীতে টিকে থাকার জন্য আমার সন্তানের কোন দক্ষতাটি বেশি প্রয়োজন, তিনি উত্তর দেবেন – ইংরেজি দক্ষতা। এ ব্যাপারে সংশয় প্রকাশের উপায় নেই। কিন্তু প্রযুক্তিনির্ভর এই বিশ্বে আরেকটি দক্ষতার কথাও কিন্তু এখন জোরেশোরে বলা হচ্ছে, আর সেটি হল প্রোগ্রামিং দক্ষতা। এর কারণ হচ্ছে, প্রযুক্তিকেন্দ্রিক এই বিশ্বে নানা ধরনের ওয়েব সাইট, আপ্লিকেশন, টুল ইত্যাদি তৈরি করা হচ্ছে আমাদের জীবনকে সহজতর করার জন্য। আছে হোম অটোমেশনের জন্য নানা গ্যাজেট যা শিশু থেকে বয়স্ক সবারই কাজে লাগছে এবং লাগবে। এমনকি আজকের অ্যালার্ম ক্লকগুলোও স্মার্ট! আর এ কারণেই আগামী দিনের নাগরিকদের জানতে হবে কীভাকে যন্ত্রের সাথে যোগাযোগ করে হবে, কিভাবে যন্ত্রকে আরো ভালভাবে চালনা করতে হবে। আর যন্ত্রের সাথে যোগাযোগের জন্যই লাগবে কোডিং-এর দক্ষতা। কেবল প্রোগ্রামারদের জন্যই কোডিং প্রয়োজন Ñ এটি সনাতনী চিন্তা। আজকের এই প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বের কোডিং-এর প্রয়োজন প্রতিটি মানুষের জন্য।
কেন দরকার?
প্রশ্নটার উত্তর উপরেই দিলাম, তবু আরেকটু বিশদভাবে বলা দরকার। প্রথমত, দীর্ঘমেয়াদে আপনার সন্তানকে যদি সফল করতে চান তাহলে তাকে কোডিং আপনার শেখাতেই হবে। এটি কেবল তার জন্য একটি মৌলিক জীবনদক্ষতা হিসেবেই বিবেচিত হবেনা, সামনের পৃথিবীতে নতুন নতুন যেসব চাকুরির আগমন ঘটবে সেগুলোর জন্যও এটি তাকে প্রস্তুত করবে। এক হিসাবে দেখা গেছে, ২০১৫ সালে ব্বিব্যাপী প্রায় ৭০ লক্ষ নতুন কাজের সৃষ্টি হয়েছিল যেগুলোতে কোডিং-এর দক্ষতা প্রয়োজন ছিল। এছাড়া বাজারের সাধারণ চাকুরিগুলোর তুলনায় প্রোগ্রামিং সংক্রান্ত চাকুরি সৃষ্টি হয়েছিল ১২ শতাংশ বেশি হারে। আরেকটি কারণ হচ্ছে, আগামী দিনে আইটি স্পেশালিস্ট, ডাটা অ্যানালিস্ট, গ্রাফিক আর্টিস্ট, ডিজাইনার,সিস্টেমস ইঞ্জিনিয়ার ও কম্পিউটার বিজ্ঞানীদের চাহিদা অনেক বেড়ে যাবে। প্রযুক্তিক্ষেত্রে আমাদের চাকুরি সংক্রান্ত দক্ষতার একটি অন্যতম অংশ হচ্ছে কোডিং, কাজেই আপনি যদি চান আপনার সন্তান প্রতিদ্ব›িদ্বতাময় বিশ্বে প্রযুক্তির ভুবনে চালকের আসন গ্রহণ করুন, তাহলেও আপনার উচিত হবে তাকে কোডিং শেখানো। এর বাইরেও কোডিং শেখার আরো কিছু সুবিধা আছে। যেমন, এটি তার মধ্যে ভাল কিছু অভ্যাস সৃষ্টি করবে। কোডিং শিখলে সে চিন্তা ও কাজের ক্ষেত্রে পদ্ধতিগত হতে পারবে। অর্থাৎ কীভাবে ধাপে ধাপে একটি সমস্যা সমাধান করতে হয় তা সে জানবে। এছাড়া, সে ধৈর্যশীল ও অধ্যবসায়ী হতে পারবে। একটা সমস্যা সমাধান করতে গিয়ে সহজে সফল না হলেও সে অন্যভাবে সেটি সমাধানের উপায় খুঁজে বের করার চেষ্টা করবে। সে কাজের ক্ষেত্রে সেরা ফল পাওয়ার চেষ্টা করবে, এভাবে তার কর্মদক্ষতার উন্নতি ঘটবে। তারা জানবে কীভাবে বিভিন্ন জিনিসকে সংগঠিত করতে হয়, কিভাবে শ্রেণিকরণ করতে হয় এবং কীভাবে প্রয়োজনীয় জিনিসগুলো খুঁজে বের করতে হয়।
কীভাবে কোডিং শিখবে?
আপনি যদি সিদ্ধান্তি নেন যে আপনার সন্তানকে কোডিং শেখাবেন তাহলে এ ব্যাপারে এখনই উদ্যোগ নিতে হবে। প্রথম সমস্যাই হলো, কোডিংটা সন্তানকে কীভাবে শেখাবেন সেটি নিয়ে অনেকেই কোনো ধারণাই করতে পারেন না। কোডিং শেখার সবচেয়ে মজার ব্যাপারা হল, এটি যে কোনো বয়স থেকেই শেখা শুরু করা যেতে পারে। যদিও এমন কিছু প্রোগ্রাম আছে যেগুলো বয়সে একটুু পাকা হবার আগে সেভাবে শেখা সম্ভব নয়, তারপরও বেশির ভাগ প্রোগ্রামেই হাতেখড়ি নেয়া যেতে পারে কম বয়সে। বাচ্চাকে কোডিং শেখানোর একটি চমৎকার পদ্ধতি হচ্ছে তার সাথে আপনিও শেখা। আপনাকেও যখন একই কাজটি করতে দেখবে, আপনার সন্তান তখন নিজেও সেটি করতে বা শিখতে বেশি বেশি আগ্রহী হবে। কাজেই তাদের সাথে সাথে কোডিং শেখার জন্য আপনিও যদি একটু সময় হাতে রাখেন তাহলে বেশ ভাল হয়। বর্তমানে অনলাইনে কোডিং শেখার বেশ কিছু প্লাটফর্ম আছে। গুগলে খোঁজখবর করলে দেখবেন, অনলাইনে বাচ্চাদের জন্য বেশ কিছু টিউটোরিয়াল আছে, আপনার বাচ্চার জন্য মানানসই একটি টিউটোরিয়াল খুঁজে বের করতে খুব বেশি সমস্যা হবার কথা নয়। নিচে এরকম কয়েকটি ওয়েব সাইটের লিংক দেয়া হল:
ক) কোড.অর্গ (https://code.org/)
খ) টিংকার (https://www.tynker.com/)
গ) টেক রকেট (https://www.techrocket.com/code/java-courses)
ঘ) প্লুরাল সাইট (https://www.pluralsight.com/kids-courses)
ঙ) কোড আ পিলার টয় (http://www.fisher-price.com/en_US/brands/think-and-learn/index.html)
চ) কিবো (http://kinderlabrobotics.com/kibo/)
ছ) স্পার্ক © (http://www.sphero.com/sprk-plus)

কোন ভাষা শেখা উচিত?
প্রোগ্রামিং ভাষার তো কোনো অভাব নেই। কাজেই কোনটা ছেড়ে কোনটা শিখতে হবে সেটি ঠিক করা একটি জটিল ব্যাপারই। শিশুর শিখন দক্ষতার সাথে সামঞ্জস্য রেখে প্রোগ্রামিং ভাষা বেছে নেয়া তো একটু কঠিনই। যাই হোক, এখানে দু-একটি ভাষা সম্বন্ধে বলা হল, যেগুলো শিশুদের কোডিংয়ে প্রথম হাতেখড়ি দেয়ার জন্য বেশি উপযোগী। প্রথমেই আসে পাইথনের কথা। পাইথন (Phyton) এই তালিকায় সবার আগে আসে কারণ এটির সিনট্যাক্স আমাদের মুখের ভাষার বেশ কাছাকাছি। পাইথনের কোড সুলিখিত এবং এটিকে এমনভাবে করা যায়, যেন আপনি কম্পিউটারের সাথে ‘কথা বলছেন’। কাজেই পাইথন দিয়ে কোডিং শেখানো শুরু করলে শিশুর জন্য উপকারী হবে। এরপরই আসে রুবি (Ruby)| । এটিও একটি চমৎকার ভাষা, যেটি দিয়ে শিশুদের কোডিংয়ে হাতেখড়ি দেয়া যায়। এর সিনট্যাক্সও শিশুদের জন্য বিশেষ মানানসই। এটি যেহেতু স্ব-ব্যাখ্যাত বাev self-explanatory, সেহেতু কীভাবে এই কোড কাজ করে সেটি শেখাতে গিয়ে অনেক সময় নষ্ট করার প্রয়োজন হবে না। এছাড়াও প্রোগ্রামিংয়ের কনসেপ্ট শিশুদের মাথায় ঢোকানোর জন্যও এটি বেশ উপযোগী। এরপর আসে জাভা-র কথা। এটি অবশ্য পইথন আর রুবির চাইতে বেশি কঠিন, তবে জাভা শেখার মাধ্যমে আপনার শিশু প্রোগ্রামিং-এর অগ্রসর ধাপগুলো সম্বন্ধে ধারণা নিতে পারবে। এছাড়া জাভা শিখলে অন্যান্য প্রোগ্রামিং ভাষাগুলো সম্বন্ধেও ধারণা লাভ করা যায়। জাভা ভাষার বয়স বিশ পেরিয়ে গেছে, কাজেই আপনার সন্তান এটির ওপর অনলাইনেও অনেক তথ্য পাবে।

 

Please Share This Post.