যার স্বপ্নপূরণে সহযোগি হিসেবে ভূমিকা রেখেছে পাঠাও

জীবনের সবচেয়ে বড় আশীর্বাদ মা-বাবার অক্লান্ত পরিশ্রম। মা-বাবা তাদের সন্তানদের স্বপ্ন পূরণের জন্য তাদের সুখ, স্বপ্ন সবকিছু ত্যাগ করেন। নিজের সুখ-স্বা”ছন্দ্যের বিনিময়ে তারা সন্তানের মুখের এক চিলতে হাসি দেখতে চান। আজকের এ লেখনীতে রয়েছে এমন একজন রাইডার যিনি পাঠাও-এর সাহায্যে তার নিজের জীবনকে ঘুরিয়ে এনেছেন সাফল্যের পথে, সেইসাথে পিতামাতার জন্য মুখে ফুটিয়েছেন তৃপ্তির হাসি। তিনি একজন সফল প্রকৌশলী এবং অবসর সময়ে ফ্রিল্যান্স পাঠাও রাইডার।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার তেজখালীতে বড় হই আমি। ছোটবেলা থেকেই বড়ই দুষ্টু ছিলাম, পড়াশোনায় মন ছিলোনা তেমন। মা বড় চিন্তায় থাকতো পাস করবো কিনা। লেখাপড়া করতে মোটেও ভালো লাগতো না। সেইসময় গ্রামের প্রতি ঘন্টা দশ টাকায় একটা সাইকেল ভাড়া করা যেত, অনেক চেষ্টা করে আমি টাকা জমাতে পারলেই সাইকেলে চড়ে গ্রাম ঘুরতাম। আমার শিক্ষকেরা ভেবে কূল পেতেন না যে এই মাঠে-ঘাটে সাইকেল চালিয়ে বেড়ানো ছেলেটা কি করবে জীবনে।

এতো দৌড়ঝাঁপের মাঝে আমার রেজাল্ট খারাপ হতে থাকে। সেই ২০০৬ সালের কথা, আমার বাবা তখন একলা এই বিশাল ঢাকা শহরে থাকতেন। শেষমেশ আমার মা আমাকে ভালোভাবে লেখাপড়া করানোর জন্য ঢাকায় পাঠিয়ে দেন। মা ভেবেছিলেন যে আমি আমার বাবার সাথে থাকলে লেখাপড়ায় মন দিবো এবং পরবর্তীতে আমার মা ও ছোট দুই ভাইবোন চলে আসবেন ঢাকা।
ঢাকায় খরচা গ্রাম থেকে অনেক বেশি, এজন্য প্রথমে বাবা চাননি যে আমরা আসি। অনেক চেষ্টার পর মা তার মন গলালেন এবং আমরা ঢাকায় এসে পড়লাম। মায়ের সার্বক্ষণিক ভাবনা ছিল আমার ভবিষৎ নিয়ে। তিনি আমাকে লেখাপড়ায় ভালো করানোর জন্য অতিমাত্রায় জোর দিতে লাগলেন। আমি সারাদিন বাসায় থেকে পড়া শেষ করতাম এবং শেষ হলে সুর করে মাকে মুখস্থ ’ পড়া শোনাতে হতো, যে পড়া সত্যিই মুখস্থ’ হয়েছে।

মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর ত্যাগ কেউ গোনায় ধরেনা। আমার বাবার সেই সামান্য উপার্জনে পাঁচজনের সংসার চালানো ছিল যেন একটি অবিশ্বাস্য ব্যাপার। তখনকার দিনগুলোতে তিনবেলা খাবার ছাড়া খুচরা খাবার যেমন বিস্কুটও ছিল একটি মহার্ঘ্য বস্তু। তবুও বাবা যখনি পারতেন হাতে করে কিছু নিয়ে আসার চেষ্টা করতেন। যেসব দিনে তিনি কিছু আনতে পারতেন না সেইদিনগুলোতে তিনি হালকা করে বলতেন যে তিনি ভুলে গিয়েছেন অথবা সময় করে উঠতে পারেননি। কিন্তু আমরা ভাইবোনেরা বুঝতাম। বুঝতাম যে এই প্রকান্ড শহরে তিনজন স্কুলে পড়া সন্তান, স্ত্রী ও মাকে নিয়ে সংসার চালানো বড্ড কঠিন। কিন্তু তখন ছোট ছিলাম অনেক সময়েই বুঝতে চাইতাম না যে বাবার হাতও বাঁধা, আমাদের সকল আবদার পূরণ করতে চাইলেই পারতেন না।

ডিপ্লোমা শেষ করে গ্যাজেট ও আনুষাঙ্গিক জিনিসপত্র নিয়ে একটা ছোট অনলাইন শপ চালাতাম। সারা শহরে সাইকেলে চালিয়ে আমার কাস্টমারদের জন্য পণ্য কিনতাম ও ডেলিভারি দিতাম। সারাদিনের সাইকেল চালানো আমার শরীরের উপর ভয়ানক চাপ ফেলতে থাকে। যেহেতু তখন আমি আমার অনলাইন ব্যবসাটির উপর পুরোপুরি নির্ভরশীল ছিলাম তাই আমি একটা মোটরসাইকেল কিনতে বাধ্য হই। এতে করে আমি অনেক দ্রুত অনেক বেশি পণ্য ডেলিভারি দিতে পারবো এবং সেইসাথে রাইড শেয়ার করেও কিছু বাড়তি টাকা হাতে আসবে।

একপর্যায়ে, যখন আমার বাবা আর্থিকভাবে একটু স্বাবলম্বী হলেন, আমি মনে সাহস জুগিয়ে গেলাম তার কাছে একটু কিছু টাকা ধার চাইতে, যাতে আমি বন্ধুর কাছ থেকে একটা সেকেন্ড হ্যান্ড বাইক কিনতে পারি। অনেক বড় একটা সিদ্ধান্ত ছিল এটা, বেশ বড় অঙ্কের ইনস্টলমেন্টের মাধ্যমে টাকাটা পরিশোধ করতে হতো আমাকে। বাবা যখন দেখলেন যে আমার অনলাইন ব্যবসাটি ভালোই চলছে, তিনি রাজি হলেন। ভাগ্যবশত আমার বন্ধু রাজি ছিল আমাকে সহজশর্তে বাইক বিক্রি করতে, সেইসাথে আমাকে বাইক চালানো ও সে শেখালো।

একটু অভ্যস্থ’ হতেই আমার লার্নার্স পারমিট পেলাম হাতে। সেইসময়ে পাঠাও-এর “আসলেই ৫০০” নামের একটি ইভেন্ট চলছিল। সেখানে গিয়ে আমি রাইডার হিসেবে সাইন আপ করলাম এবং এরপর থেকেই আমি রাইড দিয়ে চলেছি। বর্তমানে আমি ফুল টাইম চাকরি পেয়েছি তাই শুধুমাত্র অবসরসময়ে রাইড দিতে পারি। পাঠাও-এর সাথে থাকার সবচেয়ে আনন্দময় ব্যাপার হলো আমার বিভিন্ন শ্রেণীর লোকজনের সাথে পরিচয় হয়। সেইসাথে পাঠাও-এর রাইডার হওয়ায় আমার একটি সচল উপার্জনের মাধ্যম হয়েছে যার দ্বারা আমি প্রায় ৩ লক্ষ টাকা উপার্জন করেছি প্রতিদিন ৫-৬ টি রাইড দিয়ে।

আমার জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে আমার পরিবার আমাকে সমর্থন করেছে। এতো কম থাকা সত্ত্বেও আমার কোনো ইচ্ছা পূরণ করতে আমার মা-বাবা এতটুকুও দ্বিধাবোধ করেননি। হোক তা সাইকেল যেটা চালিয়ে আমি আমার ব্যবসা চালিয়েছি, হোক তা মোটরসাইকেলের জন্য ধার, যা কিনা আমার মা-বাবার সাধ্যের বাইরে ছিল। তাই যখন থেকেই আমি একটু বাড়তি উপার্জন করতে পেরেছি আমি সামান্য চেষ্টা করেছি আমার মা-বাবাকে কিছু দেয়ার। যদিও আমি কোনোভাবেই তাদের ঋণ শোধ করতে পারবোনা।

আমার বাবা সর্বদাই স্মার্টফোনের ব্যাপারে কৌতূহলী ছিলেন। যেহেতু আমি এসব ব্যাপারে বেশ অভিজ্ঞ তাই আমরা সবসময়ই নতুন সেট, দাম, ফিচার ইত্যাদি বিষয়গুলো নিয়ে আলাপ করতাম। আমার বাবা তেমন কিছু জানেন না ফোন নিয়ে। তবুও তিনি বড় একটা স্ক্রিনওয়ালা স্মার্টফোন খুব পছন্দ করেন। উনি কখনও প্রকাশে এ নিয়ে কিছু বলেনি।

এক সন্ধ্যায় কাজের পরে, বাসায় এসেই আমি বাবাকে বললাম মোটরসাইকেলে চড়ে বসতে। মোটরবাইক চেপে চললাম সবচেয়ে কাছের ফোনের শোরুমে, বললাম “বাবা যেটা ভালো লাগে পছন্দ করেন”। তিনি সারা শোরুম ঘুরে ঘুরে দেখতে লাগলেন। বড় স্ক্রিন তার ভালো লাগে, তাই তিনি একটি ব্র্যান্ডের ট্যাবলেট পছন্দ করলেন। মনে পড়লো আগের কথা, যখনই বাবা আমাকে কোনো কিছু কিনে দিতেন, রিসিটে আমার নাম লেখিয়ে নিজে দাম দিতেন। আজ গর্বের সাথে আমি বাবার নাম রিসিটে লেখিয়ে আমি দাম দিলাম। আমার কাছে এই মুহুর্তটি ছিল একেবারেই অমূল্য।

পাঠাও আমাকে আমার ছোটবেলার স্বপ্ন পূরণ করতে সাহায্য করেছে। আমার পরিবারের মুখে হাসি ফোটাতে সাহায্য করেছে যেটা আমি স্বপ্নেও ভাবিনি সম্ভব হবে। এখন আমি আমার হবু ভাগ্নের জন্য টাকা জমিয়ে চলেছি, মামা হিসেবে তাকে অনেক অনেক উপহার কিনে দেবার জন্য।

মেহেদি আলম, বয়স: ২৩,গ্রাম: তেজখালী, প্রদত্ত পাঠাও রাইড সংখ্যা: ২০০+,রেটিং: ৯৫%

-সিনিউজভয়েস

Please Share This Post.