মোবাইল লার্নিং: শিক্ষার নতুন দিগন্ত

সিনিউজ ডেস্ক: আমাদের জীবনে মোবাইল ডিভাইস এবং অ্যাপসের ব্যাপক প্রসার ঘটেছে। এর ফলে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে জ্ঞান, তথ্য ও অভিজ্ঞদের পরামর্শ গ্রহণের পথও প্রশস্ত হয়েছে। এখন আর কেবল বিধিনিষেধে ভরা প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্যেই জ্ঞান আহরণ করার বাধ্যবাধকতা নেই, এখন যে কোনো স্থানে অবস্থান করে যে কোনো উৎস থেকেই জ্ঞান আহরণ করা যায়, আর এটাই মোবাইল লার্নিং-এর মর্মকথা। প্রথাগত কম্পিউটিংয়ের স্থান এখন দ্রæত দখল করে নিচ্ছে মোবাইল কম্পিউটিং এবং ইলার্নিংও এখন ডেস্কটপ কম্পিউটার থেকে চলে যাচ্ছে মোবাইল অ্যাপসের চৌহদ্দিতে। দ্রæতগতির ইন্টারনেট, মোবাইল ডিভাইসের ক্রমবর্ধমান সামর্থ্য এবং ব্যবহারকারী-বান্ধব ইউজার ইন্টারফেস-এর কল্যাণে মোবাইল লার্নিং-এর দিগন্ত ক্রমেই বিস্তৃত হচ্ছে। এর মূলে রয়েছে কয়েকটি কারণ। প্রথমত, রিমোট ডিভাইসের সাহায্যে শিক্ষার্থীরা রিয়েল টাইমে জ্ঞান পেতে চাইছে। দ্বিতীয়ত, শিক্ষার্থীদের মধ্যে সোশ্যাল শেয়ারিংয়ের কদর বাড়ছে। তৃতীয়ত, মোবাইল প্রোডাক্টিভিটি অ্যাপসসমূহ গেম ও মজাদার জনপ্রিয় অ্যাপের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের কাছে শিক্ষাগ্রহণের বিকল্প একটি জগত উন্মোচিত করেছে। এখন সাধারণ একটি মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে কিন্ডারগার্টেনে পড়–য়া ছেলেমেয়েরা বর্ণ পরিচয় দ্রæত আত্মস্থ করছে, আবার একটি ছবিভিত্তিক কুইজ অ্যাপের সাহায্যে মেডিক্যালের শিক্ষার্থীরা মানবদেহের অ্যানাটমিও নিজেদের মনে গেঁথে নিতে পারছে।
সত্যি কথা, এখনও বেশির ভাগ মানুষের কাছে মোবাইল ডিভাইসের মূল ব্যবহারই হল, যোগাযোগ, ওয়েব ব্যবহার ও বিনোদনের জন্য। মোবাইল ডিভাইসের মাধ্যমে পড়ালেখার ব্যাপারটা এখনও সিংহভাগ মানুষের কাছে খুব বড় কোনো অর্থ বহন করবে না। অন্যদিকে, একের পর এক প্রোডাক্টিভিটি অ্যাপস-এর আবির্ভাব ঘটছে যেগুলো জ্ঞানার্থীদের নানা পদ্ধতিতে জ্ঞান-উপাদান বা ষবধৎহরহম পড়হঃবহঃ-কে সংগঠন, সংরক্ষণ, বিতরণ ও কার্যকারিতা বৃদ্ধির সুযোগ করে দিচ্ছে। এ কারণে বিশ্বের নানা প্রান্তে অনেক স্কুল ও উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এসব অ্যাপের মাধ্যমে ছাত্রছাত্রীদের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। দূরশিক্ষণের বেশ কয়েকটি লার্নিং মডিউল এখন মোবাইল ডিভাইসে সহজলভ্য হচ্ছে, যে কাজে নেটিভ মোবাইল অ্যাপ বা মোবাইল ওয়েবকে ব্যবহার করা হচ্ছে। আর এ পরিপ্রেক্ষিতেই মোবাইল লার্নিংয়ের প্রাসঙ্গিকতা দিনদিন বাড়ছে। মানুষের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে নানা রকমের মোবাইল ডিভাইস এখন অপরিহার্য অনুষঙ্গে পরিণত হয়েছে। আমরা যদি মোবাইল লার্নিংয়ের বিস্তারমান জগতটির দিকে তাকাই তাহলে এর নানা প্রয়োগক্ষেত্র দেখতে পাব।
ক. পরিপ্রেক্ষিতসহ শেখা: আপনার হাতে যদি একটি মোবাইল ডিভাইস থাকে তাহলে আপনি পরিপ্রেক্ষিতসহ তথ্যকে পেতে পারেন। যেমন, চিকিৎসাশাস্ত্রের একজন শিক্ষার্থীর মোবাইলে যদি ঔষধের ওপর একটি ডেডিকেটেড অ্যাপ থাকে তাহলে সে ক্লাসে, বাড়িতে, ল্যাবে যেখানেই থাকুক, সেটি ব্যবহার করতে পারবে। আবার তুলনামূলক সাহিত্য বা সাংবাদিকতার একজন ছাত্র প্রয়োজন হলেই নির্দিষ্ট একটি ভাষায় কোনো টার্মকে অনুবাদ করে নিতে পারবে মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে। চাওয়ামাত্র তথ্য ও সমস্যার সমাধান হাতে এনে দিতে পারার মধ্যেই লুকিয়ে আছে মোবাইল লার্নিংয়ের সার্থকতা।
খ. অগমেন্টেড রিয়েলিটি (ধঁমসবহঃবফ ৎবধষরঃু)-র মাধ্যমে শেখা: আজকাল পরিধানযোগ্য প্রযুক্তি ও ইন্টারনেট অব থিংস-এর বহুল প্রচলনের সুবাদে জ্ঞানার্জনের সকল সীমাই যেন অতিক্রান্ত হয়েছে। অগমেন্টেড রিয়েলিটি এর নানারকম হাইটেক সুবিধার মাধ্যমে তথ্য ও লার্নিং কনটেন্টকে নানাভাবে অ্যাকসেস করার সুযোগ করে দিচ্ছে আমাদের। উদাহরণস্বরূপ, একজোড়া গুগল গøাস চোখে দিলে আপনি ভয়েস কমান্ডের মাধ্যমে ইবই পড়তে বা ওয়েব সার্চ করতে পারবেন, যদি সে সময় আপনার হাত দুটো অন্য কোনো ব্যস্ত থাকে তবুও।
গ. কনটেন্ট শেয়ারিং: লার্নিং রিসোর্স ও কনটেন্ট ভাগাভাগি করার নানা রকমের শিক্ষা উপকরণ সোশ্যাল মিডিয়া বা অন্য কোনো প্লাটফর্মের মাধ্যমে রিয়েল টাইমে শেয়ার করার সুযোগ এনে দিচ্ছে মোবাইল লার্নিং। এর ফলে আমরা সময় ও দূরত্বের বাধা অতিক্রম করতে পারব, এবং জ্ঞানার্জনকে ব্যাপকভিত্তিক, অংশগ্রহণমূলক এবং সত্যিকার অর্থে কার্যকর করে তুলতে পারব। আমাদের চারদিকে এখন ওপেন অ্যাকসেসিবিলিটি, এ অবস্থায় জ্ঞানার্জনের ব্যাপারটি একইসঙ্গে স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক মাত্রা পেয়েছে। ইন্টারনেট সংযোগ থাকলেই আপনি বিশ্বের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা ইন্টারনেট-সংযুক্ত মানুষদের সাথে জ্ঞান ভাগাভাগি করতে পারবেন, আপনার ভৌগোলিক অবস্থান যেখানেই হোক না কেন।
মোবাইল লার্নিংয়ের ভুবনে বর্তমানে কয়েকটি উদীয়মান ধারা দেখা যাচ্ছে, যা এর সীমানাকে ক্রমশই বর্ধিত করে চলেছে। কর্মক্ষেত্রসহ সর্বত্র মোবাইল ডিভাইসের ক্রমবিস্তারের কারণে অনেক প্রতিষ্ঠানই এখন ‘ব্রিং ইয়োর ওন ডিভাইসেস’ (আপনার নিজের ডিভাইস সঙ্গে আনুন) বা ‘ইণঙউ’ নীতি অনুসরণের দিকে এগিয়ে চলেছে। উন্নত বিশ্বের অনেক প্রতিষ্ঠানই এখন এই নীতির প্রয়োগ করছে। ফলে কর্মীদের নিজস্ব ডিভাইসসমূহ এখন কর্মক্ষেত্রের আইটি অবকাঠামোর সাথে সমন্বিত হচ্ছে, এবং এ র নিরাপত্তা বিধানের জন্য নানারকম নীতিপদ্ধতিও আবির্ভুত হচ্ছে। নমনীয় এই ‘ইণঙউ’ নীতির কারণে কর্মীদের দক্ষতা উন্নয়নে প্রশিক্ষণসহ শিক্ষামূলক নানা কর্মকাÐ গ্রহণের পথ প্রশস্ত হচ্ছে যা কর্মীদের উৎপাদনশীলতাকে বাড়িয়ে তুলেছে। এছাড়া মোবাইল লার্নিং এখন বিরক্তিকর রকমের দীর্ঘ ইনডোর ট্রেনিংয়ের প্রয়োজনীয়তাকেও কমিয়ে দিয়েছে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ‘ইণঙউ’ নীতিকে গ্রহণ করার কারণে ইলার্নিংয়ের ধারণাটি ধীরে ধীরে মোবাইল লার্নিংয়ের সাথে একীভূত হয়ে যাচ্ছে যা কর্মীদের উৎপাদনশীলতাকে বৃদ্ধি করতে সহায়তা করছে।

মোবাইল লার্নিংয়ের আরেকটি বড় সুবিধা হচ্ছে এর মজার মাধ্যমে শেখার ব্যাপারটি। বিশেষ করে অল্প বয়সীদ্রে ক্ষেত্রে এটি বেশি প্রযোজ্য। বর্তমানে মোবাইল প্লাটফর্মে প্রচুর বিনোদনমূলক শিক্ষা উপকরণ, কনটেন্ট ও অ্যাপস পাওয়া যায়। এগুলো শিক্ষার্থীদের দ্রæত শিক্ষা অর্জনে সাহায্য করে। মজার মজার ওয়ার্ড পাজল থেকে শুর করে নানা রকমের গেমিং অ্যাপস শিশুসহ সব বয়সীদের জ্ঞানের দিগন্তকে সম্প্রসারিত করতে সাহায্য করছে।
মোবাইল লার্নিংয়ের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধির সাথে সাথে একদিকে যেমন মোবাইল ডিভাইসের সংখ্যা ও প্রচলন বাড়ছে, অন্যদিকে আমাদের জীবনের প্রতিটি পর্যায়ে মোবাইল অ্যাপস-এর ব্যবহারও বাড়ছে। ডিভাইসগুলোর সাথে প্রযুক্তিগত মূল্য সংযুক্ত (ঃবপযহড়ষড়মরপধষ াধষঁব ধফফরঃরড়হ) হওয়ার কারণে বিশ্বের সর্বত্র, নানা ধরনের শিক্ষার্থীদের ভেতর মোবাইল মাধ্যমে শিক্ষার্জনের প্রচলনও বাড়ছে। মোবাইল ডিভাইসের দাম কমা, স্টোরেজ সামর্থ্য বৃদ্ধি এবং নানা ভাষার কনটেন্ট তৈরির কারণে অদূর ভবিষ্যতে মোবাইল লার্নিং শিক্ষাখাতের মূলধারায় পরিণত হতে পারে। একই সঙ্গে ক্লাউড কম্পিউটিংয়ের প্রচলন বৃদ্ধির কারণে নানা রকম ডিভাইসে দ্রæত, সহজে ও কার্যকরভাবে কনটেন্ট শেয়ার করা সম্ভব হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ব্যাপক প্রবৃদ্ধির কারণে এগুলোর মাধ্যমেও শিক্ষা উপকরণ বিতরণ সহজতর হয়েছে।

Please Share This Post.