মোবাইল ফোন সংস্কৃতি: যস্মিন দেশে যদাচার

এটি এমন একটি ডিভাইস যেটি বিশ্বের চার ভাগের তিন ভাগ মানুষই ব্যবহার করেন। তবে গণহারে সবাই ব্যবহার করলেও মোবাইল ব্যবহারের যে সংস্কৃতি, সেটি দেশে দেশে, সমাজে সমাজে একবারেই ভিন্নরকম।
এর নামের কথাই ধরুন। যুক্তরাজ্যে যন্ত্রটিকে বলা হয় মোবাইল, তবে আমেরিকানরা একে সেলফোন নামেই চেনে। এদিকে জাপানিরা এটিকে কেইতাই (বহনক্ষম যন্ত্র) নামে ডাকলেও চীনে এসে সেটি হয়ে গেছে শোউ-জি (হাত-যন্ত্র)। বাংলাদেশে, আমরা সবাই জানি, নির্মলেন্দু গুণের দেখাদেখি কেউ কেউ এটিকে মুঠোফোন নামে ডাকেন, সুইডিশরা ডাকে নেলি (টেডি বিয়ার বা খেলনা ভাল্লুক), ইজরায়েলিরা পেলিফোন (বিস্ময়যন্ত্র) এবং জার্মানরা হ্যান্ডি। জাপানে রেলযাত্রীদের জ্ঞাতার্থে মিনিটে মিনিটে একটি ঘোষণা প্রচার করা হয়, আর তা হচ্ছে, তাঁরা যেন তাদের মোবাইল ফোনটি সাইলেন্ট বা ভাইব্রেশনের মোডে রাখেন, সেদেশে বলা হয় ‘ম্যানার মোড’ বা ভদ্রতা অথবা সৌজন্যের মোড! জাপানে সবসময়ই ব্যক্তিস্বার্থের অনেক ঊর্ধ্বে  স্থান দেয়া হয় গোষ্ঠীস্বার্থকে, এজন্য পাবলিক প্লেসে মোবাইল ফোনের ব্যবহারকে সেখানে ভীষণভাবে নিরুৎসাহিত করা হয়। এ ব্যাপারে সুইজারল্যান্ডের ফ্রাংকলিন কলেজের সহযোগী অধ্যাপক সাতোকি সুগিয়ামা বলেন, ‘সামাজিক শৃঙ্খলা ও সামঞ্জস্যকে জাপানে অত্যন্ত উঁচু চোখে দেখা হয়। এ কারণে শৃঙ্খলা বা সামঞ্জস্যে ছন্দপতন ঘটায় এরকম যে কোনো কাজ জাপানী সমাজে নিষিদ্ধ।’ মিজুকো ইতো নামে একজন সাংস্কৃতিক নৃবিজ্ঞানী বলেন, জাপানে কেউ যদি ফোনে কথা বলতে বলতে বাসে ওঠার চেষ্টা করেন, বাস চালক তাকে উঠতে দেবে না। ফোনে কেউ কথা বললে সেটাকে অন্যদের প্রাইভেসির ভঙ্গ করা হচ্ছে বলে ধরে নেয়া হয়। এ কারণে বাড়ির বাইরে এলে জাপানীরা তাদের ফোনকে ‘ম্যানার মোড’-এ রেখে দেয়। ম্যানার মোড মানে হচ্ছে, ফোন ব্যবহার করতে গিয়ে কিছুতেই অন্যের মনে বিরক্তির উদ্রেক করা যাবে না। ক্যাফে বা রেস্টুরেন্টে একেবারে বাধ্য না হলে ফোনর করবে না বা রিসিভও করবে না জাপানীরা। এরকম কোনো জায়গায় কারো ফোন যদি বেজে ওঠে তাহলে প্রচন্ড বিব্রত হয়ে হয় নিচু গলায় অত্যন্ত দ্রুত ফোনে কথা সেরে নেবে সে, নয়তো ফোনটা বন্ধ করে দেবে। এ কারণেই জাপানে ভয়েস কলের চাইতে টেক্সটিং, ইমেইল, গেম এবং বই পড়া জাপানীদের মধ্যে অনেক বেশি জনপ্রিয়।

অন্যদিকে ইতালী ও স্পেনে, অনেকটা আমাদের দেশের মতই, রাস্তাঘাটে যেখানে সেখানে মোবাইল ফোনে কথা বলাটাকে দোষের কিছু মনে করে না মানুষ। পাবলিক প্লেসে প্রাইভেট লাইফ নিয়ে উঁচু গলায় কথা বলায়ও আপত্তি নেই স্প্যানিশ বা ইতালীয়দের। এমনকি স্পেনের সবচেয়ে বড় রাষ্ট্রায়ত্ত ট্রেন কোম্পানি একটি পোস্টার ছাপিয়েছিল যাতে ট্রেনে বসে কীভাবে ফোনের মাধ্যমে পার্টনার খোঁজা যাবে তার উপায় বাতলানো হয়েছিল। ইতালীয়রাও রেস্টুরন্টে, বিজনেস মিটিংয়ে, কনফারেন্সে এবং এমনকি কনসার্টের সময়ও দেদারসে কথা বলে ফোনে। আবার মিটিং করতে করতে টেবিলের তলা দিয়ে টেক্সট মেসেজ পাঠানোও ইতালী বা স্পেনে খুবই প্রচলিত। অবশ্য জরিপ থেকে দেখা যাচ্ছে, ইউরোপের মধ্যে ফিনল্যান্ডের লোকেরাই মোবাইল ফোনে সবচেয়ে বেশি কথা বলতে পছন্দ করে, জিএসএমএ ইউরোপীয়ান মোবাইল অবজারভেটরির ২০১১ সালে করা জরিপ থেকে দেখা যাচ্ছে, ফিনল্যান্ডের লোকেরা প্রতি মাসে গড়ে ২৫৭ মিনিট ফোনে কথা বলে। অবশ্য নকিয়ার মাতৃভূমি হিসেবে ফিনল্যান্ডের লাকেরা এ কাজ করতেই পারে। তাদের ঠিক পেছনেই, ২৪০ মিনিট নিয়ে আছে অস্ট্রিয়ানরা, আর ইউরোপের মধ্যে মোবাইল ফোনে সবচেয়ে কম কথা বলে মাল্টাবাসীরা। তারা প্রতি মাসে মাত্র ৪৬ মিনিট ফোনে কথা বলে কাটায়।

এদিকে আফ্রিকা এবং ভারতের কোথাও কোথাও আরেক প্রথাও চালু আছে, যার নাম ফ্ল্যাশিং বা বিপিং। জোনাথন ডোনার নামে মাইক্রোসফট ইন্ডিয়ার এক গবেষক এ বিষয়ে ‘দি রুলস অব বিপিং’ নামে একটি পেপারও লিখেছেন। এটাতে তিনি বলেন, ‘বিপিং খুব সহজ একটা জিনিস। কোনো নাম্বারে ফোন করে একজন, তারপর ঐ লোক ফোন ধরার আগেই সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়া।’ ভারত বা বাংলাদেশের মত গোটা আফ্রিকাজুড়েও মিসড কল বা বিপিং খুব জনপ্রিয়। বিপিং-এর মাধ্যমে মানুষ যেসব মেসেজ দেবার চেষ্টা করে তার মধ্যে আছে ‘এসো আমাকে এসে নিয়ে যাও’, ‘কেমন আছ?’, ‘ধন্যবাদ’, ‘আমাকে ফোন কর’ ইত্যাদি। এ ব্যাপরে শশাংক বেঙ্গলি নামের একজন ব্লগার সুন্দর কথা বলেছেন, ‘ফ্লাশিং বা বিপিং (মিসড কল)-এর ব্যাপারে অলিখিত কিছু নিয়ম কানুন আছে। ধরুন গাড়ির মেকানিক আপনাকে জানাতে চাইছে, আপনার গাড়িটি মেরামত করা হয়ে গেছে। তখন সে আপনাকে মিসড কল দিতে পারে, কারণ গাড়িটি আপনার, কাজেই ওটা ফেরত চাইলে আপনার উচিত হবে তাকে কল দেয়া। সে কেন গাঁটের পয়সা খরচ করবে। আবার এর মধ্যে বকেয়াটা প্রাধান্য পরম্পরা বা হায়ারার্কিও আছে। যেমন, অধস্তন কর্মী ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে ফ্ল্যাশিং করতে পারে, কারণ তার আয় বেশি। তবে সে যদি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার কাছ থেকে কোনো সুবিধা চায় তাহলে এটা করা উচিত হবে না। সেক্ষেত্রে ফ্ল্যাশিং না করে উচিত হবে কল করা।’ একই সঙ্গে আরেকটি সতর্কতাবাণউও প্রদান করেছেন তিনি, ‘যদি কোনো নারীর মন জয় করতে চান তাহলে ভুলেও তাকে কখনো মিসড কল দেবেন না।’
ভারত বা আমাদের মত দেশে সিনেমা হলে, হাটে বাজারে, বাসে ইত্যাদি জায়গায় ফোন রিসিভ করা একটি অতি সাধারণ ব্যাপার। ভীড়েভর্তি বাসে সবার চারপাশের সবার ধৈর্যের পরীক্ষা নিতে নিতে জলদগম্ভীর কণ্ঠে একেবারে ব্যক্তিগত ব্যাপারে আলাপ করা মানুষ প্রায়ই চোখে পড়ে, ব্যাপারটা যে একবারেই শালীন হচ্ছে না সেটা বোঝার মত ক্ষমতা অধিকাংশ মানুষেরই নেই। রিংটোনের কথাটাও না বলাটা অন্যায় হবে। প্রায়ই দেখা যাবে, চারদিক মাতিয়ে উচ্চগ্রামে বেজে উঠল একটা হিন্দি গানের মিউজিক, কী ব্যাপার, গান আসছে কোত্থেকে এই নিয়ে যখন চিন্তাভাবনা শুরু করেছেন তখনই গানের আওয়াজ থেমে গিয়ে কর্কশ গলায় কেউ একজন বলে উঠলেন: হ্যালো। মানে, যার ফোনে কল এসেছে তিনি ফোনটা ধরলেন। মজার ব্যাপার হচ্ছে, এই জিনিসটা ভারতীয় উপমহাদেশের মত আফ্রিকাতেও খুব চলে। তবে সেখানে একটা জিনিস প্রচুর দেখা যায়, মিউজিকের বদলে সেখানে ব্যবহার করা হয় বাইবেলের বাণী!

– সিনিউজভয়েস ডেস্ক

 

Please Share This Post.