মেক-আ-থন ২০১৬’তে নতুন ৩২টি প্রেটোটাইপ উদ্ভাবন

ওয়ার্ল্ড ব্যাংক এবং বেটার স্টোরিজ এর যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিত হলো ‘মেক-আ-থন ২০১৬’। ডাক টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের তথ্যপ্রযুক্তি অধিদপ্তর এবং অারো ১৮টি প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতায় মেধাবী তরুণদের উদ্ভাবন নিয়ে এই আয়োজন অনুষ্ঠিত হয়েছে।

বাংলাদেশের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানের উদ্দেশ্যে এই আয়োজন প্রকৌশল, কৃষি, ব্যবসা, ফ্যাশন টেকনোলজি ও ডিজাইনের শীর্ষ ১০০ জনকে নিয়ে আয়োজিত হয়েছে।

মোট ৪০০ আবেদনপত্র থেকে মেক-আ-থনে শীর্ষ ১০০ জনকে বাছাই করা হয়। তারপর তাদেরকে ৬৮ ঘণ্টাব্যাপী একটি দীর্ঘ কর্মপ্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্রোটোটাইপ ( তাদের তৈরি যন্ত্রের প্রথম মডেল) তৈরি করতে বলা হয়। কাগজ ও থ্রিডি মাধ্যমে তারা ৩২টি প্রটোটাইপ নির্মাণ করে। এই প্রোটোটাইপগুলোতে বাস্তব জীবনের সমস্যাগুলো প্রাধান্য পেয়েছে। এছাড়াও স্বাস্থ্যসেবা, যোগাযোগ, অবকাঠামো, কৃষি, বায়োমেডিকেল ইঞ্জিনিয়ারিং, শক্তি উৎপাদন, শারীরিক প্রতিবন্ধকতা এবং নবায়নযোগ্য শক্তি উৎপাদন প্রভৃতি সমস্যার সমাধান খোঁজা হয়েছে।

সেরা দশটি প্রজেক্ট হলো-

* কিউসি প্রো: এটি এমন প্রোটোটাইপ যা দিয়ে খাদ্যগুণ নির্ধারণ করা যাবে। এটি একটি কৃষি পণ্য।

* আলট্রাক্যান: এটি দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের চলতে ফিরতে সাহায্য করবে।

* ফ্লোবাডি: ডুবে যাওয়ার হাত থেকে রক্ষায় সাঁতার না জানা শিশু বা বড়দের পরিধেয়।

* স্মার্ট কার্ড বেইসড পাবলিক সার্ভিসেস: গণ পরিবহনে সহায়তা করবে।

* ইউএভি ফর হিউম্যানেটি: ড্রোন টেকনোলজি চালানোর জন্য এরিয়াল সমাধান।

* ডব্লুবট: ওয়াটারবডির জন্য স্যানিটেশনের পদ্ধতি।

* স্মার্ট গ্যাস বার্নার: গ্যাসের অপচয় কমাবে।

* হ্যাপিনেস ফর অল: এটি স্বল্প মূল্যের ড্রোন।

* ড্রাইভারস গো সেফ: ড্রাইভিংয়ে সহায়তা করবে এমন একটি যন্ত্র।

* হেলথ অ্যাসিস্ট্যান্ড অ্যান্ড হ্যারাসমেন্ট প্রিভেনশন: একটি পরিধানযোগ্য মেডিকেল সহায়তা দেয় এমন যন্ত্র।

অন্য প্রজেক্টগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য রোবো নার্স, যা মৌলিক স্বাস্থসুবিধা দিতে সক্ষম। ট্রাফিক আই, যা কম ভীড়যুক্ত রাস্তা বাছাই করে এবং গাড়ি চলতে সাহায্য করে।

আইসিটি প্রতিমন্ত্রী জুনায়েদ আহমেদ পলক সমাপনী অনুষ্ঠানে বলেন,  ‘এ বছরের সেরা দশটি প্রোটোটাইপকে এর পরের বছর অবশ্যই নতুন প্রযুক্তি পণ্যতে পরিণত করতে হবে। নিঃসন্দেহে ইন্ডাস্ট্রি ও মার্কেট এর সঙ্গে একাডেমিক রিসার্চের ব্রিজ তৈরি করার চমৎকার উদ্যোগ এটি।’

উল্লেখ্য, আইসিটি প্রতিমন্ত্রী অনুষ্ঠানেই ‘হ্যাপিনেস ফর অল’ নামের ১০০টি ড্রোন অর্ডার করেন। যা মাত্র তিনশ পঞ্চাশ টাকায় বিক্রি হবে। বাক্কোর প্রেসিডেন্ট অর্ডার করেন ১০টি ড্রোন।

সমাপনী অনুষ্ঠানে বেটারস্টোরিজ এর প্রধান গল্পকথক মিনহাজ আনওয়ার বলেন, ‘প্রতিযোগীরা বিভিন্ন দিকে তাদের উদ্ভাবনী ক্ষমতা কাজে লাগিয়েছে এটা বলতেই হয়। এখানে তড়িৎ চুম্বক, তরলের প্লবতা, রেলওয়ের খরচ কমানোর জন্য তড়িৎ চুম্বকের ব্যবহার, সেচে সুবিধা হয় এবং সেইসঙ্গে যেন পানির অপচয় কম হয় এমন যন্ত্র এখানে তৈরি করা হয়েছে।’

তিনি আরো বলেন, ‘এটা অভাবনীয় যে মাত্র তিনদিনের অনুপ্রেরণায়, প্রশিক্ষণে কীভাবে ৩২টি প্রোটোটাইপ তৈরি হলো, এটা আমাকে বাংলাদেশের ভবিষ্যত নিয়ে আরো আশাবাদী করে তুলেছে।’

মেক-আ-থন উপলক্ষে ২৩টি ওয়ার্কশপের আয়োজন করা হয়েছিল, যা দেশি বিদেশি প্রশিক্ষকেরা পরিচালনা করেন। বাংলাদেশ, কানাডা, পেরু, জাপান, ফিনল্যান্ড, যুক্তরাষ্ট্র প্রভৃতি দেশের নাগরিকেরা এখানে অংশগ্রহণ করেছেন।

আইসিটি প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে গোলটেবিল বৈঠকে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে কিভাবে প্রবৃদ্ধির মূল চালিকাশক্তিতে রূপান্তর করা যায় তা নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। গোলবৈঠকে উপস্থিত ছিলেন উপাচার্যবৃন্দ, শিক্ষাবিদ, ফ্যাব ল্যাব গুরু, বাংলাদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকগণ, ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের কর্মকর্তাগণ, প্রাইভেট সেক্টর ও ইন্ডাস্ট্রিয়াল নেতৃত্ব।

‘মেক-আ-থন ২০১৬’ তে গুরুত্ব পেয়েছে নতুন উদ্ভাবন, নতুন আইডিয়ার কাঁটাছেড়া, মানুষের জীবনে নতুন জিনিস তৈরির ফলাফল, মানব কেন্দ্রিক ডিজাইন, ডিজিটাল ফ্যাব্রিকেশন প্রভৃতি।

সর্বপ্রথম যেটি আলোচনায় আসে তা হচ্ছে, ‘আপনি কি বাংলাদেশের জন্য সমস্যার সমাধান করতে চান’। এই আলোচনাটি করেন একেএম আব্দুল্লাহ, যিনি ট্রেড অ্যান্ড কমপেটিটিভনেস গ্লোবাল প্র্যাকটিস এর একজন সেক্টর স্পেশালিস্ট। সাওরি মাইযুমি ওয়ার্ল্ড ব্যাংকে আইসিটি ইনোভেশন অ্যান্ড এডুকেশন কনসালটেন্ট, ভিক্টর ফ্রয়েড পেরুর ফ্যাব ল্যাব লিমার প্রতিষ্ঠাতা, কাজী মনিরুল কবীর প্রশিক্ষণ দেন। কোন বিষয়ের ওপর প্রথম চিন্তা ও সেটা থেকে উদ্ভাবনের পথ তৈরি করায় সাহায্য করেছেন খালেদ মাহমুদ। মেইড ইন বাংলাদেশ প্রতিযোগীদের এমআইবি স্পিরিট স্টুডিওতে নিয়ে যায়। ফলে তাদের কাস্টোমার ডিসকভারি বিষয়ে একটা ভালো ধারণা জন্মায়।

আয়োজনের অংশ হিসেবে মেকার ফেয়ারে লাইভ মিউজিক, শো-কেইস ও প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়। এখানে একই ছাদের নিচে লাইভ অন সাইট পেইন্টিং সহ শিল্প কলার অন্যান্য শাখার মোট নয়টি প্রদর্শনী হয়েছে।

সমাপনী অনুষ্ঠানে ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের সিনিয়র অপারেশনস অফিসার (গ্লোবাল প্র্যাকটিস) মো. মখলেসুর রাহমান, যিমানা আহমেদ, প্রোগ্রাম ম্যানেজার ইএমকে সেন্টার, সোহেল আহমেদ, ডেপুটি প্রজেক্ট ডিরেক্টর, হেকাপএবং এন বি ম্যাককনেল, ডিরেক্টর, আমেরিকান সেন্টার উপস্থিত ছিলেন।

আমেরিকান সেন্টারের এন ম্যাককনেল এতো সুন্দর একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করার জন্য মেক- আ-থন বাংলাদেশ’র আয়োজকদের সাধুবাদ জানান।

এই অনুষ্ঠানে ৩২টির ভেতর থেকে সেরা দশটি প্রোটোটাইপকে সম্মানিত করা হয়। তাদেরকে ১ বছর বেটার স্টোরিজের ইনকিউবেশনে নতুন উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলা হবে। যা তাদেরকে নেতৃত্ব এবং উন্নয়নে আরো বড় পদক্ষেপ রাখতে সাহায্য করবে। ‘বেটার স্টোরিজ’ এর আগেও ‘হ্যান্ডিমামা’ ও ‘স্মার্টকম্পেয়ার’ এর মতো সফল গল্প তৈরিতে ভূমিকা রেখেছে।

মূলত ‘মেক-আ-থন ২০১৬’ এই বিশ্বাস থেকে শুরু হয়েছিল যে, বাংলাদেশি গবেষক, উদ্ভাবকগণ এখন নতুনভাবে কাজ করার জন্য একদম প্রস্তুত। ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের একাডেমিক ইনোভেশন ফান্ড এবং হেকাপের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন ল্যাবরেটরি প্রতিষ্ঠার কথা ভাবা হচ্ছে।

ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের মোখলেসুর রাহমান বলেন, ‘বাংলাদেশের জ্ঞান বিকাশে হেকাপ ও ওয়ার্ল্ড ব্যাংক ফ্যাবল্যাবের মাধ্যমে ভূমিকা রাখতে চায়। কিন্তু সেই সঙ্গে এটাও জরুরি যে উদ্ভাবকদের একটি জোরালো কমিউনিটি তৈরি করা।’

সাতটি বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ার ফলে মেক-আ-থন দল মে মাসের পুরোটাই পথে পথে কাটিয়েছে। সাত হাজার কিলোমিটার মত পথ পাড়ি দিয়ে এক লাখ শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণে এবং দুই হাজার কারিগর নিয়ে জমজমাট ছিল এই যাত্রা।

ভবিষ্যতে শিক্ষা, এবং স্বাস্থ্যকর বুদ্ধিদীপ্ত ব্যবসার উন্নয়নে মেক-আ-থন এমন আরো মেক-আ-থন আয়োজন করতে চায়। ছোট হোক বড় হোক নতুন কিছু তৈরি করা এবং বাংলাদেশে নতুন নেতৃত্ব সৃষ্টি করা জন্য এটা দরকারিও বটে।

‘মেক-আ-থন ২০১৬’ এর পার্টনার ছিল- ইএমকে সেন্টার, দ্য মেসেঞ্জার, টেকশপ বিডি, টেকনো নিডস, রিবাস, ড্যানকেক, পাই ল্যাবস, হাই ফাই পাবলিক।

 

– সিনিউজভয়েস ডেস্ক

Please Share This Post.