মানবাধিকার রক্ষায় প্রযুক্তি

সারা বিশ্বের আনাচে কানাচে মানবাধিকার যে আজ দারুণভাবে লঙ্ঘিত সে ব্যাপারেকারো মনে সন্দেহ নেই। সিরিয়া থেকে ইরাক, আর্জেন্টিনা থেকে আমেরিকা সর্বত্রই আজ মানবাধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে দারুণভাবে। আর একই সঙ্গে বেড়ে যাচ্ছে মানবাধিকার কর্মীদের কাজও। অত্যাচারী শাসক আর শোসকদের চোখ এড়িয়ে মানবাধিকারের বার্তা বয়ে নেবার কাজটিতে এখন তাদের পদে পদে সম্মুখীন হতে হচ্ছে প্রচুর বিপদের। কারণ যেখানেই মানবাধিকতার কর্মীদের কার্যকলাপের প্রমাণ মিলছে সেখানেই প্রচন্ডভাবে নেমে আসছে নির্যাতনের খড়গ, আর সেই খড়গের নিচে পড়ে ছিন্নভিন্ন হয়ে যাচ্ছে শত শত মানুষের প্রাণ। সময় যতই গড়াচ্ছে এ কারণেই মানবাধিকার কর্মীরা বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে নতুন নতুন সব বিপদের মোকাবেলা করছেন প্রাণান্ত পরিশ্রমে। আর এখানে এসেই মানবাধিকার কর্মীদের পাশে দাঁড়িয়েছে তথ্য প্রযুক্তি। বলতে পারেন সারা বিশ্বের আনাচে কানাচে ছড়ানো মানবাধিকার কর্মীদের মাঝে খুবই নীরবে নিঃশব্দে ঘটে চলেছে এক বিপ্লব। এই নীরব বিপ্লবের কেন্দ্রস্থলে আছে তথ্য প্রযুক্তির সহায়তা। তথ্য প্রযুক্তির সহায়তা নিয়ে তারা মানবাধিকার সংগ্রামকে করে তুলছেন জোরদার, মোকাবেলা করছেন নানারকম বিপদের। কম্পিউটার প্রযুক্তি, বিশেষ করে এর বিশেষ একটি শাখা ক্রিপটোগ্রাফি আছে এই নীরব বিপ্লবের কেন্দ্রস্থলে। ক্রিপটোগ্রাফি সফটঅয়্যার: যেটি গোপন কোড ব্যবহার করে উপাত্তকে কিছু দুর্বোধ্য সাংকেতিক প্রতীকে বা চিহ্নে রূপান্তরিত করে, সেটিই পরিগণিত হচ্ছে অত্যাচারীদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে মানবাধিকার কর্মীদের যুদ্ধের
অন্যতম হাতিয়ারে। বিশ্ব জুড়ে মানবাধিকার কর্মীরা এখন এমন সব সফটঅয়্যার ব্যবহার করছেন যেগুলোর মাধ্যমে সাধারণ জনগণের মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাগুলো তারা লিপিবদ্ধ করছেন এবং সরকারী রোষানল থেকে বাঁচার জন্য সেসব উপাত্তকে ক্রিপটোগ্রাফির মাধ্যমে সংকেতায়িত করে মানবাধিকারের সংগ্রামকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন বহুদূর। এই নীরব বিপ্লবে একটি অন্যতম নেতৃত্ব দানকারী শক্তি হিসেবে কাজ করছেন ড.প্যাট্রিক বল। এই ভদ্রলোক আমেরিকান এসোসিয়েশান ফর দ্য এডভান্সমেন্ট অব সায়েন্স নামে একটি সংগঠনের ডিপুটি ডিরেক্টর। বিশ্বের আনাচে কানাচে মানবাধিকার লঙ্ঘন হচ্ছে এমন সব জায়গায় গোপন ভ্রমণের মাধ্যমে মানবাধিকার কর্মীদের তথ্য প্রযুক্তির সহায়তায় মানবাধিকার রক্ষার লড়াইকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়াতে সাহায্য করছেন ড. বল। তিনি দু একটি জায়গায় নয়, বরং সারা পৃথিবীর অনেকগুলো জায়গায় মানবাধিকার সংক্রান্ত ডাটাবেস তৈরি এবং সংরক্ষণে সাহায্য করেছেন এবং করছেন, এসব জায়গার মধ্যে আছে এল সালভেডর, কসোভো, গুয়েতেমালা, হাইতি, ইথিওপিয়া, আলবেনিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা ইত্যাদি।১৯৯০-এর দশকের শুরুর দিকে এ সংক্রান্ত তার কর্মকান্ড শুরু করেন বল। তিনি যখন এই পথে নামেন তখন বেশির ভাগ মানবাধিকার কর্মীই তথ্য প্রযুক্তিকে পছন্দ নয়, বরং ভয় এবং ঘৃণা করতেন। এর কারণও আছে। এর আগ পর্যন্ত বেশির ভাগ অত্যাচারী শোষকই তথ্য প্রযুক্তিকে ব্যবহার করে তাদের অত্যাচার এবং শোষণ কাজ চালাত। এই কারণে মানবাধিকার কর্মীরা ঐতিহ্যগতভাবেই তথ্য প্রযুক্তিকে সন্দেহের চোখে দেখতেন। ফলে শুরুর দিকে বল- এর কাজটি ছিল খুবই কঠিন। মানবাধিকারের কর্মীদের মনোভাব এবং মানসিকতা পাল্টানোর কঠিন কাজটি তার এবং তার সহকর্মীদের করতে হত। যাই হোক, এভাবে বেশ কিছুদিন চলে যাবার পর হাওয়া পাল্টাতে শুরু কর। বল নিজেই বলেছেন, ‘এতদিনে মানবাধিকার কর্মীরা বুঝতে শুরু করল যে, কম্পিউটার তাদের একটি বড় হাতিয়ারে পরিণত হতে পারে। কম্পিউটার এমন একটি যন্ত্র যেটি বিপুল পরিমাণে উপাত্তকে প্রক্রিয়াকরণ করার কাজটি সম্পন্ন করতে পারে। তারা আস্তে আস্তে হলেও অনুধাবন করতে পারল যে এই যন্ত্রটি তাদের কাজকে করে দিতে পারে অনেক সহজ এবং এটি এমনই একটি
প্রযুক্তি প্রযুক্তি যার সাহায্য ছাড়া তারা আগামী দিনে চলতে পারবেনা।’ তিনি আরো বলেন, ‘আমি একবার কম্বোডিয়ায় মানবাধিকার কর্মীদের কাজ তত্ত¡াবধান করতে গেলাম। সেখানে গিয়ে আমি অবাক হয়ে গেলাম এই কারণে যে প্রতিটি কর্মীরই টেবিলে হাজার হাজার ফাইলের এক বিরাট স্তুপ। এই স্তুপ ঘেঁটে একটি মাত্র উপাত্ত, মনে করুন গত এক মাসে কম্বোডিয়ায় কতজন নারী ধর্ষিতা হয়েছেন এটি বের করতে দুই সপ্তাহ লেগে গেলেও আশ্চর্য হবার কিছু থাকতনা।’ বল এবং তার সহকর্মীদের প্রচেষ্টায় এবং সস্তা কম্পিউটার ও সফটঅয়্যার বাজারে আসার পর এই পরিস্থিতি ধীরে হলেও পাল্টাতে শুরু করে। ডাটাবেস, ¯েপ্রডশিট, ওয়ার্ড
প্রসেসিং এবং কমিউনেকশান প্রোগ্রামের কারণে এখন সম্ভব হয়েছে এমনকি ছোট কোনো মানবাধিকার সংগঠনের পক্ষেও অত্যন্ত বিজ্ঞানসম্মতভাবে মানবাধিকার
লঙ্ঘন এবং নির্যাতনের ঘটনাবলীর হিসাব রাখা এবং পরস্পরের মধ্যে সেসব হিসাব এবং তথ্য বিনিময় এবং ভাগাভাগি করা। এই বিশ্লেষণাত্মক নির্ভুলতা মানবাধিকার কর্মীদের হাতে তুলে দিয়েছে অত্যন্ত শক্তিশালী একটি অস্ত্র। দেখা গেছে কোনো সাক্ষী যখন সরকারী কোনো নির্যাতনের ব্যাপারে তথ্য প্রদান বা প্রদানের চেষ্টা করে তখন তারা সরকারী পেটোয়া বাহিনীর আক্রমণের শিকার হয় এবং এই আক্রমণের মুখে প্রাণ বা শরীরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ হারিয়েছেন এমন লোকের সংখ্যাও প্রচুর। বল-এর ভাষায়, ‘হিউম্যান রাইটস গ্রæপগুলো ক্রিপটোগ্রাফি ব্যবহার করছেন ডাটাবেস সংরক্ষণ এবং সুরক্ষা, তদন্ত করতে, কোনো ঘটনার কথা রিপোর্ট করতে এবং সাক্ষীদের চিহ্নিত করতেও। এগুলোর সবই হচ্ছে এমন সব উপাত্ত যেগুলো অত্যন্ত স্পর্শকাতর এবং এগুলোর কারণে যে কোনো সময় যে কারো জীবনও বিপন্ন হতে পারে।’ আর এ কারণেই দরকার ক্রিপটোগ্রাফি এবং এনক্রিপশানের মাধ্যমে এসব ডেটাকে সুরক্ষা প্রদান করা যাতে সরকারী কর্তৃপক্ষের
হাতে গেলেও এসব উপাত্ত তারা পাঠোদ্ধার করতে না পারে।ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর হিউম্যান রাইটস রিসার্চ-ই হচ্ছে বিশ্বের প্রথম সংগঠন যারা পিজিপি নামে পরিচিত একটি জনপ্রিয় ক্রিপটোগ্রাফি সফটঅয়্যার ব্যবহার করে মানবাধিকার উপাত্ত সম্বলিত তাদের ডাটাবেসগুলোর সুরক্ষা প্রদানের কাজটি করছে। ক্রিপটোগ্রাফির মধ্যে লুকোচুরি বা খারাপ কিছু নেই। বরং এটি কার্যকরভাবেই ব্যবহৃত পারে আইন প্রয়োগ এবং মানবাধিকার রক্ষার মত গুরুত্বপূর্ণ কাজের একটি হাতিয়ার হিসেবে। দেশে দেশে অত্যাচারী সামরিক সরকার এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনে সিদ্ধহস্ত নির্যাতনকারী সরকারী বেসরকারী শক্তিগুলোকে ঠেকাতে এ কারণেই তথ্য প্রযুক্তি এখন আলোচিত হচ্ছে একটি অন্যতম প্রেরণাদায়ী এবং সাহায্যকারী শক্তি হিসেবে। বল এবং তার মত এরকম শত শত মানবাধিকার কর্মীরা বিশ্বের আনাচে কানাচে
কাজ করে চলেছেন এই সত্যটিকে বাস্তবায়নের কঠিন উদ্দেশ্যটিকে সামনে রেখেই।

Please Share This Post.