ভবিষ্যৎ পৃথিবীর মানুষ্যবিহীন গনপরিবহন যুগের উত্থান

ধারনা করা হয় প্রাচীন মানবসভ্যতায় চাকা আবিষ্কার হয় খ্রিস্টপূর্ব  ৫০০০ সালে মেসোপটেমিয়ায়। খ্রিস্টপূর্ব ৩৭০০ সালে  উত্তর কাকেশাসের বাসিন্দারা ঠেলাগাড়ি ব্যবহার করতো । চীনে চাকা যুক্ত গাড়ির প্রচলন হয় খ্রিস্টপূর্ব ১২০০ সালের দিকে । পরবর্তীতে সভ্যতার অগ্রগতির প্রতীক  চাকার ব্যবহার সমগ্র এশিয়া ও ইউরোপে ছড়িয়ে পড়ে খ্রিষ্টপূর্ব ৪র্থ সহস্রাব্দ নাগাদ ।

চাকা আবিষ্কার মানবসভ্যতার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। মূলত চাকা ব্যবহারের মধ্য দিয়েই মানবজাতি যান্ত্রিকতার ছোঁয়া পায়, চাকার গতি মানবজাতির উৎপাদনশীলতা বাড়িয়ে দেয়। চাকা আবিস্কারের ফলে মানুষ যানবাহন ব্যবহার করে সুবিশাল দূরত্ব পাড়ি দিতে পেরেছে। চাকা মানুষের পরিশ্রমকে লাঘব করেছে, সময়কে সাশ্রয় করেছে। ১৭৬৯ সালে জেমস ওয়াটের বাষ্পীয় ইঞ্জিন আবিষ্কার চাকাকে করেছে গতিময়। এরপর কালক্রমে পেট্রোল ইঞ্জিন, ডিজেল ইঞ্জিন, জেট ইঞ্জিন সহ আরও শত-শত প্রযুক্তি পরিবহন ব্যবস্থাকে প্রতিনিয়ত দ্রুততর করে তুলেছে।

একটা সময় পর্যন্ত পরিবহন ব্যবস্থায় উন্নয়ন বলতে কেবলমাত্র দ্রুতগামী যানবাহনকে বোঝাত। সে যুগের পর্দা নেমেছে। বর্তমান সময়ে পরিবহনকে মানুষ্যবিহীন ব্যবস্থায় রূপান্তরের প্রয়াস চলছে। আমাদের চোখের আড়ালেই  মানুষ্যবিহীন পরিবহন ব্যবস্থার বাস্তবতা এগিয়ে গিয়েছে অনেকদূর। ড্রাইভার বা চালকবিহিন পরিবহন ব্যবস্থা উন্মোচন করতে যাচ্ছে নতুন একটি যুগের।

সামনের দিনগুলোতে আপনি যে গাড়িটিতে চরবেন সেটিতে থাকবেনা কোন ড্রাইভার, বিষয়টি ভাবতে বেশ অবাক লাগলেও বাস্তবতা কল্পনাকেও হার মানিয়েছে। অবশ্য সুদীর্ঘকাল থেকেই প্লেনে ‘অটোপাইলট’ প্রযুক্তি চলে আসছে। মানুষ আকাশে প্লেন চালানোর দায়িত্ব কম্পিউটারের উপর ছেড়ে দিয়ে হাজার-হাজার মাইল নিশ্চিন্তে এবং নিরাপদে পাড়ি জমাচ্ছে। সংযুক্ত আরব-আমিরাতে ২০১৮ সালেই ড্রাইভারলেস টাক্সি সার্ভিস পরীক্ষামূলক ভাবে শুরু হয়েছে, ধারনা করা হচ্ছে আরব-আমিরাতে ২০৩০ সালের ভেতরে মোট গাড়ির ২৫% হবে অটোমেটেড কার। দুবাই পলিশও ড্রাইভার ছাড়া গাড়ির ব্যবহার শুরু করেছে। অপরাধীদের পাকড়াও করতে এই গাড়ি দ্রুতবেগে ছুটে যাবে নিজে নিজেই। শুধু অপরাধিকে ধরার জন্য নয়, বায়োমেট্রিক ডাটাবেস থেকে রাস্তার দুপাশের মানুষদের চেহারা দেখে সনাক্ত করবে এদের মধ্যে কেউ অপরাধি আছে কিনা এমনকি সন্দেহভাজন বিস্ফোরক, অস্ত্র বা মাদকদ্রব্যও সনাক্ত করবে এই গাড়ি।

উবার এবং গুগোল এই দুই টেকজায়ান্ট অটোমেটেড গাড়ির টাক্সি সার্ভিস এবং বাণিজ্যিক উৎপাদনের প্রতিযোগিতায় নেমেছে। উবার ড্রাইভারলেস টাক্সি সার্ভিস চালুর  ঘোষণা দিয়েছে। জাপানে ২০১৮ সালেই অটোমেটেড গাড়ির ব্যবহার শুরু হয়েছে। ২০২০ সালের টোকিও অলম্পিককে সামনে রেখে জাপান পুরোদমে অটোমেটেড ট্যাক্সি সার্ভিস চালু করার পরিকল্পনা নিয়েছে।

বিশ্বজুড়ে প্রতি বছর প্রায় ১২,৫০,০০০ মানুষ সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যায়। গুগোল এক গবেষণায় দেখিয়েছে বর্তমানে সড়ক দুর্ঘটনার জন্য মানবসৃষ্ট কারন হচ্ছে ৯৪%। নেশাগ্রস্থ অবস্থায় গাড়ি চালানো, ট্রাফিক আইন ভঙ্গ করা, অতিরিক্ত গতি, গাড়ি চালানোর সময় মোবাইল ফোনে কথা বলা ইত্যাদি কারনে সড়ক দুর্ঘটনার জন্য মানুষই সম্পূর্ণভাবে দায়ী।  অটোমেটেড এসব গাড়ির প্রচলন হলে সড়ক দুর্ঘটনার পরিমান ৯০% পর্যন্ত কমে আসতে পারে।

ধারনা করা হয় ২০৫০ সালের ভেতর বিশ্বের ৭০% মানুষ শহরে বসবাস করবে। সুবিশাল সেই শহরাঞ্চলে ট্রাফিক জ্যাম , যাতায়াত খরচ ইত্যাদি বিষয়ে সাশ্রয়ী সমাধান এনে দিবে নতুন দিনের  অটোমেটেড কার। এধরনের বুদ্ধিমান গাড়ির প্রচলনের ফলে রাস্তায় গাড়ির সংখ্যাও ৪৩% কমে আসবে। বাংলাদেশে  অটোমেটেড কার প্রচলিত হলে এদেশের রাস্তায় গাড়ির সংখ্যা কয়েকগুন পর্যন্ত কমার সুযোগ রয়েছে। এক গবেষণায় দেখা গেছে অটোমেটেড গাড়ি ব্যবহারের কারনে শুধুমাত্র আমেরিকায় ৪৮৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার সড়ক দুর্ঘটনা ক্ষয়ক্ষতি সাশ্রয় সম্ভব এবং এরফলে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি পাবে অতিরিক্ত ৬৪৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।

গুগোলের অটোমেটেড গাড়ি ইতিমধ্যে ২ মিলিয়ন মাইল পথ পাড়ি দিয়ে ফেলেছে বিড়ম্বনা ছাড়াই। গুগোল ছাড়াও টেসলা, উবার সহ অন্যান্য অনেক কোম্পানির অটোমেটেড কারও সুদীর্ঘ পথ একা একাই পাড়ি দিয়েছে। এসব অটোমেটেড গাড়ির পথচলায় দুই-একটি দুর্ঘটনা যে হয়নি এমনটি নয়, তবে দেখা গিয়েছে সেসব দুর্ঘটনার জন্য দায়ভার পথচারি মানুষ এবং চালকদের উপরেই বর্তায়। তবে যেসব শহরে ম্যপিং ব্যবস্থা ভাল নয় সেখানে এসব অটোমেটেড কার কতখানি সফলতা লাভ করবে সেটি নিয়ে সংশয় আছে, বাস্তবতা হচ্ছে পৃথিবীর বেশিরভাগ শহরেই ম্যপিং ব্যবস্থা ড্রাইভারলেস গাড়ির জন্য এখনো উপযোগী হয়নি, এছাড়াও আবহাওয়া বিষয়ক প্রতিকূলতা   অটোমেটেড  গাড়ির জন্য এখনো চ্যলেঞ্জিং।

ভবিষ্যৎ পৃথিবীর পরিবহন ব্যবস্থা কেমন হবে তা নিয়ে জল্পনা-কল্পনার অন্ত নেই। মানুষের দ্রুতবেগে ছুটে চলার বাসনা প্রতিনিয়ত আধুনিক সব প্রযুক্তির জন্ম দিয়ে চলেছে। তবে ভবিষ্যৎ পৃথিবী যে ড্রাইভারদের জন্য সুখকর হবে না সেটা মোটামুটি নিশ্চিতভাবেই বলা যায়। ব্যক্তিগত গাড়ি থেকে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, গনপরিবহন , ট্যাক্সি ইত্যাদি পরিষেবায় মানব ড্রাইভারের স্থান দখল করে নিবে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স সম্পন এসব অটোমেটেড গাড়ি। সামনের দিনগুলোতে রাস্তায় বাসগুলো চালাবে কম্পিউটার নিজেই। পণ্য পৌঁছে দেয়ার ট্রাক বা লরিগুলোও হবে ড্রাইভার বিহীন। টেসলা মটরস ইতোমধ্যে সেই স্বপ্নকে বাস্তবতায় রূপ দিয়েছে।

আগামীর পৃথিবীর পরিবহন ব্যবস্থায় যে কেবলমাত্র অটোমেটেড গাড়িই আধিপত্য বিস্তার করবে এমনটি নয়। ধারনা করা হচ্ছে স্বল্প দূরত্ব অতিক্রমের জন্য জেটপ্যাকের প্রচলন ব্যাপক ভাবে বাড়বে। মানুষ এধরনের স্যুট পড়ে অনেকটা পাখির মতই আকাশে স্বল্প দূরত্বের পথ পাড়ি জমাবে। অনলাইন শপের প্রডাক্ট ডেলিভারির দায়িত্ব নিয়ে নিবে ড্রোন, অবশ্য এখনই অনেক টেকজায়ান্ট কোম্পানি ড্রোনের মাধ্যমে পণ্য পৌঁছে দেয়া শুরু করে দিয়ছে। বুলেট ট্রেনের বিকল্প হিসাবে স্বল্প দূরত্বের পথে মানুষকে চোখের পলকে গন্তব্যে পৌঁছে দিবে এলন মাস্কের হাইপারলুপ ।

আগামীর পৃথিবীর নৌপথেও থাকবে অটোমেটেড জাহাজের আধিপত্য। রোলস রয়েস  ইতোমধ্যে অটোমেটেড জাহাজের বাণিজ্যিক উৎপাদনের ঘোষণা দিয়েছে , আশা করা যাচ্ছে আগামী ১০ থেকে ১৫ বছরের ভেতরে সমুদ্রেও বিচরন করবে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স সম্পন্ন এধরনের সমুদ্রগামী জাহাজ। গবেষণায় দেখা গিয়েছে সমুদ্রগামী বিভিন্ন নৌযানের দুর্ঘটনার পেছনে মানবসৃষ্ট কারন ৭৫%। নাবিকদের ক্লান্তি-অবসাদ, ভুল সিদ্ধান্ত ইত্যাদি এসকল দুর্ঘটনার পেছনে দায়ী।  অটোমেটেড জাহাজের প্রচলনের ফলে সামুদ্রিক দুর্ঘটনার ক্ষয়ক্ষতি থেকে পরিত্রাণের সম্ভাবনা বৃদ্ধি পাবে। জলদস্যুদের আক্রমণের হাত থেকে এধরনের মানুষ্যবিহীন জাহাজকে নিরাপত্তা দেবে যোদ্ধা ড্রোন।

আগামীর পৃথিবীর নতুন প্রজন্মের পরিবহন ব্যবস্থা বাস্তবায়নের জন্য মাঠে নেমেছে টেসলা, মার্সিডিজ বেঞ্ছ, অডি, জিএম , নিশান, গুগোল, উবারের মত টেকজায়ান্টরা। ২০২০ সালের ভেতরেই পৃথিবীর বিভিন্ন শহরের রাস্তায় অটোমেটেড কারের দেখা পাওয়া যাবে। বাংলাদেশে বছরে হাজার-হাজার মানুষের মৃত্যু হয় সড়ক দুর্ঘটনায়, মারাত্মক ভাবে আহত হয় এর কয়েক গুন। অটোমেটেড কার প্রযুক্তি যদি সড়ক দুর্ঘটনার পরিমান কমাতে পারে তবে সেটাই হবে এই প্রযুক্তির বড় সফলতা। প্রযুক্তির অপব্যবহারের পরিবর্তে অটোমেটেড কার মানবজাতির একটি মৌলিক সমস্যার সমাধান করবে এটিই আগামী দিনের প্রত্যাশা।

ফজলে রাব্বী খান, প্রকৌশলী ও কলামিস্ট, ইমেইল:  fazlyrabbi77@gmail.com

-সিনিউজভয়েস/জিডিটিজুন৩/১৯

 

Please Share This Post.