বিপিও বাংলাদেশের নতুন সম্ভাবনা-ওয়াহিদ শরীফ

বিপিও মানে হচ্ছে ‘বিজনেস প্রসেস আউটসোসিং‘। বর্তমানে বাংলাদেশে বিপিও খাতে যারা কাজ করেন তাদের অর্ধেকই শিক্ষার্থী। তারা কোনো না কোনো কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার পাশাপাশি আউটসোর্সিংয়ের কাজ করে থাকেন। বাংলাদেশে কল সেন্টার সহ বিভিন্ন আউটসোর্সিং কোম্পানিতে কাজ করছে প্রায় ৩০ হাজার তরুণ। আউটসোর্সিং বলতে শুধু কল সেন্টার আউটসোর্সিং নয়। টেলিকমিউনিকেশন, ব্যাংক, ইন্স্যুরেন্স, হাসপাতাল, হোটেলের ব্যাক অফিসের কাজ, এইচআর, আইটি, অ্যাকাউন্ট সবকিছুই এর অন্তর্ভুক্ত। এসব কাজ আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে করার বিষয়টি সাধারণভাবে ‘বিপিও’ বলে পরিচিত।

বিশ্বের সবচেয়ে ক্রমবর্ধমান ইন্ডাস্ট্রি হচ্ছে এই বিপিও খাত। আইসিটি-তে বর্তমানে বাংলাদেশের যে পরিবর্তনের গল্প, তার উল্লেখযোগ্য অবদান হচ্ছে বিপিও খাতের। বছরে প্রায় ১৮০ মিলিয়ন ডলার বিদেশি মুদ্রা আসে আইসিটি খাত থেকে। সরকার আইসিটি সেক্টর থেকে ২০২১ সাল নাগাদ ৫ বিলিয়ন ডলার আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে, আশা করা যায় তার সিংহ ভাগ অংশই আসবে বিপিও থেকে।

photo

বাংলাদেশে ‘বিপিও’ একটি নতুন সম্ভাবনার নাম। কারণ বাংলাদেশের বিপিও ব্যবসার প্রবৃদ্ধি বছরে শতকরা ১০০ ভাগের বেশি। বর্তমানে বিশ্বেজুড়ে বিপিওর বাজার ৫০০ বিলিয়ন ডলার। সেখানে এ পর্যন্ত বাংলাদেশ দখল করতে পেরেছে মাত্র ১৮০ মিলিয়ন ডলার! সুতরাং বিষয়টি স্পষ্ট যে, বিপিও খাতে একটা বিশাল বাজার পড়ে আছে। এখন যদি বাংলাদেশ এই খাতে নজর দেয় তাহলে তৈরি পোশাকশিল্পের পরই বিপিও হবে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের সবচেয়ে বড় খাত।

এই মুহুর্তে দেশের তৈরি পোশাকশিল্পে প্রায় ৫০ লাখ মানুষ কাজ করছে, যার সিংহ ভাগই নারী। এদের গড় মজুরি মাসে ৫ হাজার। দুঃখজনক বাস্তবতা হচ্ছে, এই বিপুল জনগোষ্ঠী সরকারকে কোনো ট্যাক্স দেয় না। এই ৫০ লাখ মানুষ খেয়েপরে বেঁচে আছে, পরিবারের ব্যায়ভার নির্বাহ করছে, কিন্তু দেশের উন্নয়নে কোনো প্রত্যক্ষভাবে কোনো ভূমিকা রাখতে পারছে না।

একই অবস্থা বৈদেশিক শ্রমবাজারে অর্জিত মুদ্রার (রেমিটেন্স) ক্ষেত্রেও। প্রায় ৯০ লাখ মানুষ বাইরে থেকে বাংলাদেশে টাকা পাঠাচ্ছে। বিদেশ থেকে অর্জিত এই রেমিটেন্সে কিন্তু কোনো ট্যাক্স দিতে হচ্ছে না। ফলে সরকারের আয় বাড়ছে না।

আমাদের দেশের মধ্যবিত্ত পরিবারের তরুণরা না পারে রেস্তোরাঁর ওয়েটার হতে, না পারে দোকানে কাজ করতে। আবার সম্মানজনক চাকরিও সবাই পায় না। এই তরুণদের কাজের প্রধান ক্ষেত্র হতে পারে বিপিও।
বিপিও খাতে এই তরুণ ছেলে-মেয়েরা মধ্যম আয়ের কাজ করতে পারে। যাদের বাৎসরিক আয় হতে পারে ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকা। এদের কিন্তু ট্যাক্স দিতে হবে। ফলে এর মাধ্যমে তারা দেশের উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারবে।

এখন প্রয়োজন বিপিওকে তরুণ প্রজন্মের কাছে আরও জনপ্রিয় করা। কারণ যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও জাপানে এই মুহূর্তে প্রোগ্রামারের প্রয়োজন প্রায় ২০ লাখ। আগামী ৫ বছরে ২০ লাখ প্রোগ্রামার কোডার এর প্রয়োজন হবে জাপান, ইউরোপ, আমেরিকাতে। তাদের সেই তরুণ জনগোষ্ঠী নেই, জাপানে ৫০% জনগোষ্ঠী ৫০ এর উর্ধে। ইউরোপ আমারিকাতেও তাদের তরুণ প্রজন্মের সংকট বিরাজ করছে। বাংলাদেশ যদি তার বিপুল সংখ্যক তরুণ জনগোষ্ঠীকে সঠিক প্রশিক্ষণ দিতে পারে তাহলে আগামী ৫ বছরে ইউরোপ, আমেরিকা, জাপানের বাজার আমাদের তরুণদেরাই নিয়ন্ত্রণ করবে। আশার কথা, ইতিমধ্যে সরকারের তথ্য ও প্রযুক্তি বিভাগ বিভিন্ন পদক্ষেপ হাতে নিয়েছে এবং দক্ষ জনগোষ্ঠী তৈরির কার্যক্রম অব্যহত রেখেছে।

বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় ২ লাখ ৫০ হাজার শিক্ষার্থী স্নাতক ডিগ্রি লাভ করছে। এদের বিরাট অংশ বিপিও সেক্টরে কাজ করতে পারে। যে কোনো শিক্ষাগত যোগ্যতার মানুষের এখানে কাজ করার সুযোগ রয়েছে। এই খাতে যারা কাজ করবেন তাদের মাত্র দুইটি যোগ্যতা থাকা প্রয়োজন। প্রথম যোগ্যতা-‘অ্যাবিলিটি টু লার্ন’ অর্থাৎ আমি জানি না, জানতে চাই- এই মনোভাব থাকতে হবে। দ্বিতীয় যোগ্যতা- ‘কমিউনিকেশন স্কিল’ তথা যোগাযোগে দক্ষতা।

২০০৮ সাল থেকে হাঁটি হাঁটি পা পা করে বাংলাদেশে যে ‘বিপিও সেক্টর’-এর সূচনা হয়েছিল তা এরই মধ্যে একটি সম্মানের জায়গা তৈরি করতে পেরেছে, নিজেদের সক্ষমতা ও উল্লেখযোগ্যতা তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছে। বিপিও সেক্টর বাংলাদেশের এক নতুন সম্ভাবনার নাম।

বিশ্ব ব্যাংকের পর্যবেক্ষণে বাংলাদেশ ইতিমধ্যেই নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশে প্রবেশ করেছে। বাংলাদেশ যদি বিপিও খাতকে যথাযথভাবে করায়ত্ব করতে পারে তবে খুব দ্রুতই ‘মধ্যম আয়ের’ দেশে পরিণত হবে। এমন উদাহরণ আমাদের সামনেই আছে। লক্ষ্য করলে দেখা যাবে শুধু বিপিও খাতের কার্যকর প্রতিফলনের মাধ্যমে ফিলিপাইন ও ভারত বিশ্বের সর্বোচ্চ অথনৈতিক প্রবৃদ্ধির দেশে পরিণত হয়েছে। ভারতের বাৎসরিক আয় ১৫০ বিলিয়ন ডলার, আর এই খাতে ফিলিপাইনের আয় ১৮ বিলিয়ন ডলার। শ্রীলংকাও জোর কদমে এগিয়ে যাচ্ছে, তারাও ইতিমধ্যে বছরে আয় করছে ৩ বিলিয়ন ডলার।

বাংলাদেশের পক্ষেও এমন অর্জন সম্ভব। কারণ, বাংলাদেশের তরুণ জনগোষ্ঠী কোনো না কোনোভাবে প্রযুক্তির সঙ্গে যুক্ত। তাছাড়া, বাংলাদেশের রয়েছে বিপুল সংখ্যক তরুণ জনশক্তি, যা মোট জনসংখ্যার দুই তৃতীয়াংশ। সর্বশেষ আদমশুমারির তথ্য থেকে জানা যাচ্ছে, বর্তমানে বাংলাদেশে ১৬ থেকে ৩৫ বছর বয়সী মানুষের সংখ্যা প্রায় ১১কোটি। এর মধ্যে প্রায় ৬৫% জনগোষ্ঠীর বয়স ৩৫ বছরের নিচে। এই ধরনের ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ট ব্যবহার করে দক্ষিণ কোরিয়া বিগত ৪০ বছরে উন্নত দেশে পরিণত হয়েছে।

আমরাও ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ট কাজে লাগিয়ে তথ্যপ্রযুক্তি তথা বিপিও সেক্টরে সফল হতে পারি। আমাদের উচিত আমাদের বিপুল সংখ্যক তারুণকে সঠিক দিকনির্দেশনা দেওয়া, সঠিক ভাবে কাজে লাগানো। ২০২১ সাল নাগাদ বিপিও খাত থেকে ১ বিলিয়ন ডলার আয় করা তেমন কঠিন কিছু নয়। এ জন্য প্রয়োজন সরকারি-বেসরকারি সমন্বিত উদ্যোগ।

* ওয়াহিদ শরীফ: সহ-সভাপতি, বাংলাদেশ এসোসিয়েশন অব কল সেন্টার অ্যান্ড আউটসোর্সিং (বাক্য)

সিনিউজভয়েসডেক্স

Please Share This Post.