প্রযুুক্তি জগতের ৫ পথিকৃৎ

তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি একদিনে আজকের পর্যায়ে আসেনি। দীর্ঘদিন ধরে বহু মানুষের চেষ্টায় আজকের অবস্থানে এসেছে এটি। এঁরা হচ্ছেন স্বাপ্নিক মানুষ, যাঁরা নানাভাবে নিজেদের অবদানে, মেধায় ও ভাবনায় সৃমদ্ধ করেছেন প্রযুক্তি ভুবনকে।

এদের মধ্যে বিল গেটস বা স্টিভ জবসের মতো মানুষকে আমরা সবাই চিনলেও আমাদের অগোচরে থেকে গেছেন অসংখ্য মানুষ। বলাই বাহুল্য, খ্যাতির আশায় এসব মানুষ কাজ করেন না। তাঁরা কাজ করেন সৃষ্টি আনন্দে।

আজকের লেখায় এরকমই কিছু প্রযুক্তি পথিকৃতের সঙ্গে পরিচিত হয়ে নিতে পারি আমরা, যাঁদের অবদানে ধন্য হয়েছে কম্পিউটার ও প্রযুক্তি ভুবন।

 

জন আটানা সফ

জন ভিনসেন্ট আটানা সফ ছিলেন একজন আমেরিকান পদার্থবিজ্ঞানী ও উদ্ভাবক। বিশ্বের সর্বপ্রথম ইলেকট্রনিক ডিজিটাল কম্পিউটারের নির্মাতা হিসেবেই তিনি স্মরণীয় হয়ে আছেন। তিনি ১৯০৩ সালে জন্মগ্রহণ করেন এবং ১৯৯৫ সালে মৃত্যুবরণ করেন। ১৯৩০-এর দশকের শেষভাগে আইওয়া স্টেট কলেজে তিনি বিশ্বের প্রথম ইলেকট্রনিক ডিজিটাল কম্পিউটার তৈরি করেন। তবে এই কম্পিউটারের নির্মাতা হিসেবে তাঁর কৃতিত্বকে চ্যালেঞ্জ করে আদালতে যাওয়া হলেও এই মামলা ১৯৭৩ সালে নিষ্পত্তি হয় এবং তাঁকেই এই কৃতিত্ব দেয়া হয়। তাঁর তৈরি স্পেশাল পারপাস কম্পিউটার আটানা সফ বেরি কম্পিউটার নামে পরিচিত। অনুদান হিসেবে পাওয়া ৬৫০ ডলার খরচ করে তিনি তাঁর এক ছাত্র ক্লিফোর্ড বেরির সঙ্গে মিলে এই কম্পিউটারটি তৈরি করেন। সে বছরের নভেম্বর মাসে এটির প্রোটোটাইপ তৈরি শেষ হয়। তিনি জানান, তার আগের বছর ইলিনয় অঙ্গরাজ্যের রক আইল্যান্ডে ভ্রমণের সময় এই কম্পিউটারের প্রধান কিছু আইডিয়া তার মাথায় আসে। এই কম্পিউটারে প্রয়োগ করা মূল আইডিয়াগুলোর মধ্যে বাইনারি গণিত এবং বুলিয়ান লজিক উল্লেখযোগ্য। একই সঙ্গে ২৯টি লিনিয়ার ইকুয়েশন সম্পন্ন করা হয় এই কম্পিউটারের সাহায্যে। এই কম্পিউটারটির কোনো সেন্ট্রাল প্রসেসিং ইউনিট ছিল না তবে এটি ভ্যাকুয়াম টিউব ব্যবহার করে ডিজিটাল পদ্ধতিতে হিসাব নিকাশের কাজ করা হতো এতে। আরো ছিল রিজেনারেটিভ ক্যাপাসিটর মেমোরি, যেটি আজকের ডিআরএএমস মেমোরি যে প্রক্রিয়ায় চালিত হয় সেটির মতো করেই কাজ করত।

 

বার্নার্ড ডেইনস

বিশেষ করে নেটওয়ার্কিং-এর জগতে ডেইনস চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন ইথারনেট টেকনোলজির অন্যতম পথিকৃৎ হিসেবে। বিশেষ করে ফাস্ট ইথারনেট-এর জন্য IEEE স্ট্যান্ডার্ড এবং গিগাবিট নেটওযার্কিং টেকনোলজি উদ্ভাবনের জন্য তিনি বিখ্যাত। ১৯৯২ সালে ডেইনস গ্র্যান্ড জাংশান নেটওয়ার্ক নামে ফাস্ট ইথারনেট-এর সুইচ নির্মাণের জন্য একটি প্রতিষ্ঠান স্থাপন করেন। ১৯৯৫ সালে এই প্রতিষ্ঠানটিকে সিসকো সিস্টেমের কাছে বিক্রি করে দেন তিনি। ১৯৯৪ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন প্যাকেট ইঞ্জিন, এটি ছিল গিগাবিট ইথারনেট সুইচ নির্মাতা একটি প্রতিষ্ঠান, এটিকে আবার ১৯৯৮ সালে বিক্রি করে দেয়া হয় অ্যালকাটেল-এর কাছে। এরপর ২০০০ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ওয়ার্ল্ড ওয়াইড প্যাকেটস নামে একটি প্রতিষ্ঠান। এর উদ্দেশ্য ছিল অপটিক্যাল ব্রডব্যান্ড কানেক্টিভিটির জন্য সর্বপ্রথম কস্ট ইফেক্টিভ এবং ফিউচারপ্রুফ সলিউশন প্রদান করা। ২০০২ সালে লিনাক্স নেটওয়ার্ক্স-এর বোর্ড চেয়ারম্যান হিসেবে নির্বাচিত হন ডেইনস।

 

আন্দ্রে এরশভ

জন্ম ১৯৩১ সালে আর মৃত্যু ১৯৮৮ সালে। এরশভ ছিলেন সাইবেরিয়ান স্কুল অব কম্পিউটার সায়েন্সের একজন প্রতিষ্ঠাতা। থিওরেটিক্যাল ও সিস্টেমস প্রোগ্রামিং-এর জগতে প্রথম হাতে গোণা যে কজন রাশান কম্পিউটার বিজ্ঞানী কাজ করে তাদের মধ্যে  অন্যতম এরশভ। তিনি অনেকগুলো সিস্টেমস প্রোগ্রামিং সমস্যা নিয়ে কাজ করেন: এর মধ্যে আছে প্রোগ্রামিং ল্যাংগুয়েজে ডিও স্টেটমেন্ট সমস্যা, কমন সাবএক্সপ্রেশন এলিমিনেশনের ক্ষেত্রে হ্যাশ অ্যাড্রেসিং, গ্লোবাল মেমোরি অ্যাডমিনিস্ট্রেশন ইত্যাদি। তাঁর লেখা বই ‘এ প্রোগ্রামিং প্রোগ্রাম ফর বিইএসএম কম্পিউটার’ হচ্ছে স্বয়ংক্রিয় প্রোগ্রামিং-এর ওপর লেখা বিশ্বের সর্বপ্রথম বইগুলোর একটি।

জেমস গসলিং

গসলিং ছিলেন সান মাইক্রোসিস্টেমস-এর তৈরি জাভা ল্যাংগুয়েজের সেরা স্থপতি। গসলিং মূল জাভা ল্যাংগুয়েজ ডিজাইন করেন এবং এর অরিজিনাল কম্পাইলার ও ভার্চুয়াল মেশিন উদ্ভাবনকরেন। তিনি স্যাটেলাইট ডেটা একুইজিশন সিস্টেমস উদ্ভাবন করেন, এটি হচ্ছে ইউনিক্স-এর একটি মাল্টি প্রসেসর ভার্সন। সেই সঙ্গে তিনি আরো উদ্ভাবন করেছেন কয়েকটি কম্পাইলার, মেইন সিস্টেমস এবং উইন্ডো ম্যানেজার। এর পাশাপাশি তিনি একটি WYSIWYG টেক্সট এডিটরও তৈরি করেছেন। এটি হচ্ছে একটি কনস্ট্রেইন্ট বেজড ড্রয়িং এডিটর। সান মাইক্রোসিস্টেমস-এ গসলিং লিড ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে কাজ করে এবং NeWS উইন্ডো সিস্টেমস ডিজাইন করেন।

 

বিলজয়

বিলজয় এন্ডি ব্যাকলোট শেইম, ভিনোদ খোসলা এবং স্কট ম্যাকনিলির সঙ্গে মিলে সান মাইক্রোসিস্টেমস স্থাপন করেন। তিনি যখন বার্কলি গ্রেড স্কুলের ছাত্র ছিলেন তখন বার্কলি ইউনিক্স-এর প্রিন্সিপাল ডিজাইনার ছিলেন তিনি। সান-এ কাজ শুরু করার পর তিনি এর নেটওয়ার্ক ফাইল সিস্টেমস ডিজাইন করেন এবং সেই সঙ্গে স্পার্ক মাইক্রো প্রসেসর আর্কিটেকচারের একজন কো-ডিজাইনার ছিলেন তিনি। ১৯৯১ সালে তিনি আল্ট্রা-স্পার্ক আই-এর বেসিক পাইপলাইন ডিজাইন করেন। বর্তমানে ব্যবহৃত সান-এর স্পার্ক মাইক্রো প্রসেসরে এই বেসিক পাইপলাইন ব্যবহা করা হয়। ১৯৯৭ সালে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন জয়কে প্রেসিডেন্সিয়াল ইনফরমেশন টেকনোলজি অ্যাডভাইজরি কমিটির কো-চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ করেন। ১৯৯৮ সালে তাঁকে নিযুক্ত করা হয় সান মাইক্রোসিস্টেমস-এর চিফ সায়েন্টিস্ট হিসেবে।

 

– সিনিউজভয়েস ডেস্ক

Please Share This Post.