২০১৯-এ প্রযুক্তিবিশ্বের হালচাল-কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা

ভবিষ্যৎ নিয়ে নানা জল্পনাকল্পনা করা যায় বলেই না জীবন এত সুন্দর। তবে ভবিষ্যৎ নিয়ে আমাদের এসব চিন্তাভাবনা সবসময়ই যে সত্যি হবে তাওতো নয়। প্রতিবার একটা করে নতুন বছর আসে আর আমরা ভবিষ্যৎ নিয়ে স্বপ্ন আর কথার ডালি সাজাই। বছর শেষে সালতামামি করলে দেখা যায়, সেসব স্বপ্ন আর কথার অনেকগুলোই বাস্তবের মুখ দেখেনি। আর প্রযুুক্তির কথা কী বলব! প্রযুক্তি নিজেই এতটা চঞ্চল আর অস্থিরমতি যে তাকে নিয়ে চূড়ান্ত কোনো কথা বলাই যায় না। আজকের পুর্বাভাসকে কাল সকালেই মিথ্যে প্রমাণিত করতে প্রযুক্তি এক পায়ে খাড়া রয়েছে। গত বছরের কথাই ধরুন। কত মহা মহাপন্ডিত কত কথা বললেন, তার সবগুলো কি বাস্তবে রূপ নিতে পেরেছে? পারেনি। ঠিক একইভাবে আজ আমরা প্রযুক্তি নিয়ে যেসব কথা বলব সেগুলো যে আগামিতে সত্যি হবে তার কোনো নিশ্চয়তা আমরাও দিতে পারব না। তবু প্রতি বছরের মতোই নিয়ম মেনে ঠিকই হাজির হয়েছি ২০১৯-এর সেরা প্রযুক্তিগুলোর বয়ান দিতে। প্রিয় পাঠক, বছর শেষে নাহয় মিলিয়ে নেবেন কোনটি কতটুকু সত্যি হল। আসুন তাহলে, আর কথা না বাড়িয়ে চলে যাই ২০১৯ সালে প্রযুক্তিবিশ্বের হালচালের বয়ানে।এ সময়টি তথ্যপ্রযুক্তির জন্য একটি উদ্দীপক সময়। উত্তেজনাকর সময়। কারণ একইসাথে অনেকগুলো নতুন প্রযুক্তি আমাদের জীবনকে আন্দোলিত করছে। এর অনেকগুলোই আছে এখনও শৈশবকালে। ফলে এগুলোর অগ্রগতির ছন্দও অনেক বেশি উদ্দাম। আজ বাদে কালই এগুলো অনেকটাই পরিপক্ব হয়ে যাবে। তখন আমাদের জীবনে সুদুরপ্রসারি পরিবর্তন নিয়ে আসবে এগুলো। এর মধ্যে প্রথমেই বলতে হয় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের কথা। বর্তমানে নানা ক্ষেত্রে এর নানামুখী প্রয়োগ আমরা দেখতে পাচ্ছি। ২০১৯ সাল নিশ্চিতভাবেই এর জন্য একটি আগ্রহোদ্দীপক সময় হতে যাচ্ছে। একইসাথে এক নিঃশ্বাসে আরো যে কয়েকটি প্রযুক্তির কথা বলতেই হবে সেগুলো হচ্ছে ব্লকচেইন, এজ কম্পিউটিং, ভার্চুয়াল রিয়েলিটি ইত্যাদি। এই লেখায় আমরা এক এক করে এসব প্রযুক্তির অগ্রগতির খোঁজখবর করার চেষ্টা করছি। আসুন তাহলে, শুরুতেই শুরু করা যায় আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স তথা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা
২০১৯-এর শেষ নাগাদই যে আমরা পরিপূর্ণভাবে কর্মক্ষম একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবস্থা পেয়ে যাব তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। তবে এ মুহূর্তে আমরা যে রূপে একে পাচ্ছি সেটি বছর শেষে অনেকটাই পরিপক্ব অবস্থায় এসে যেতে পারে। স্বয়ংচালিত গাড়ি আর কর্মক্ষেত্রে রোবটের পদধ্বনি ক্রমশই জোরালো হয়ে উঠছে। রাতারাতি যে এগুলো আমাদের জীবনের মূলধারায় ঢুকে পড়বে তা নয়। বরং ধীরে ধীরে এক ধরনের সমন্বয় আর সংশ্লেষণের মধ্য দিয়েই আমরা যাব। ব্যবসায় প্রক্রিয়ার ত্রুটিবিচ্যুতি চিহ্নিত করা, সাইবার সিকিউরিটির মান উন্নত করা, উপাত্ত বিশ্লেষণকে আরো নিখুঁতভাবে করা এবং পুনরাবৃত্তি ঘটে এমন কিছু মানবীয় কাজ স্বয়ংক্রিয় করার মধ্যেই ২০১৯-এ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার গন্ডি  সীমিত থাকবে। এ মুহূর্তে এর যেটুকু উন্নতি হয়েছে তাতে এটা বরা যায় যে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা পদ্ধতি ব্যবহার করার জন্য আপনাকে যে বিরাট কোনো বিশেষজ্ঞ হতে হবে তা নয়। এমন সময় আসছে যখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দক্ষতা বা “AI skills” আপনার বায়োডাটার সাধারণ একটা আইটেম হয়ে উঠবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ভবিষ্যৎ নিয়ে আমাদের সবার মধ্যেই কৌতুহল প্রবল। অনেকেই তাই জানতে চান, ২০১৯ সালে এই ক্ষেত্রে ঠিক কী কী নতুন ঘটনা ঘটবে। বিশেষজ্ঞরা এ বিসয়ে যেসব ধারণা পোষণ করেন সেগুলো নিচে সংক্ষিপ্তভাবে বর্ণনা করা হল:

হার্ডওয়্যার সাপোর্ট: হার্ডওয়্যারকে সমর্থন জোগানোর ক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আরো দক্ষ হয়ে উঠবে। নিউরাল নেটওয়ার্ককে প্রশিক্ষিত করার ক্ষেত্রে বিশেষ দক্ষতাসম্পন্ন কম্পিউটার চিপ ২০১৯ সালেই বাজারে আসবে, যদিও এগুলোর আসল যাত্রা শুরু হবে ২০২০-এ। বস্তুত সিপিইউ থেকে জিপিইউ (গ্রাফিক্যাল প্রসেসিং ইউনিট)-এ রূপান্তরের মাধ্যমেই এক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অগ্রসর যাত্রা শুরু হয়। এর মধ্যে গুগল নিয়ে আসে টেন্সর প্রসেসিং ইউনিট বা টিপিইউ – যার মূল উদ্দেশ্য ছিল নিউরাল নেটওয়ার্ক ও মেশিন লার্নিং। বর্তমানে গুগলের ক্লাউড টিপিইউ ক্রমশই পরিচিতি পাচ্ছে।

কাস্টম বিল্ট এআই চ্যাটবট: আগের যে কোনো সময়ের চাইতে চ্যাট উইন্ডোর সাথে আমরা এখন অনেক বেশি পরিচিত। চ্যাট-এর মানও আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে। ফলে লাইভ চ্যাটে অংশ নিতে আগের তুলনায় আমরা অনেক বেশি আগ্রহীও। ২০১৯ সালে বিভিন্ন কোম্পানি তাদের চাহিদামত কাস্টম-বিল্ট চ্যাটবট ব্যবহারের আগের তুলনায় বেশি আগ্রহী হবে।

ন্যাচারাল ল্যাংগুয়েজ জেনারেশন: এনএলজি তথা ন্যাচারাল ল্যাংগুয়েজ জেনারেশন ডাটাকে টেক্সট ও মুখের ভাষায় রূপান্তরিত করে। আমাদের চারপাশে ছড়িয়ে থাকা বিপুল পরিমাণ ডাটাকে ভিজুয়ালাইজ করার জন্য এটি একটি চমৎকার মাধ্যমস হিসেবে আবির্ভুত হয়েছে। ফাইন্যান্স ও ইনস্যুরেন্স, ই কমার্স, মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা, পর্যটন ইত্যাদি ক্ষেত্রে এনএলজির ব্যবহার ক্রমশই বাড়বে।

ইন্টারনেট অব থিংস-এর বহুল ব্যবহার: ইন্টারনেট অব থিংস (IOT) নিয়ে অনেক কথাই হচ্ছে এবং সামনের দিনগুলোতে সে কথা বাড়বে বই কমবে না। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাথে নতুন আরেক প্রযুক্তি এজ কম্পিউটিং একত্রিত হয়ে ইন্টারনেট অব থিংসকে মানুষের আরো হাতের নাগালে নিয়ে আসবে। আমাদের ফোনের কম্পিউটিং চিপসগুলো আগের চেয়ে স্মার্ট সব অ্যাপ্লিকেশনকে সাপোর্ট করে, যেগুলো কাজ করার জন্য এমনকি ইন্টারনেট কানেকশনও লাগে না। গাড়ি থেকে শুরু করে ফ্রিজ পর্যন্ত অন্যান্য ডিভাইসের ক্ষেত্রেও এটিকে কাজে লাগিয়ে ইন্টারনেট অব থিংস-এর ক্ষেত্রে নতুন মাত্রা যুক্ত করবে ২০১৯।

বিক্রয়ের কাজ হবে আরও পারসোনলাইজড: সাম্প্রতিক সময়ে বিক্রয়ের (Sales) কাজে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার নতুন মাত্রা পেয়েছে। কেনাকাটার সময় পারসোনালাইজড অনলাইন সহায়তার প্রচলন দিন দিন বাড়ছে। বেচাকেনার উপাত্ত দিনদিন বাড়ছে, ফলে বিপণনে সম্পৃক্ত মানুষজন কাস্টমাররে সম্বন্ধে আরো বেশি তথ্য পচ্ছেন। কেউ একজন আমার কর্মকন্ড অনুসরণ করছে- এটা যদিও আমাদের বেশির ভাগের কাছেই ভাল লাগবে না, এটাও কিন্তু মানতে হবে যে, এর ফলে ঠিক যেসব পণ্য/সেবা আমি চাই সেগুলোই আমার দোরগোড়ায় এসে হাজির হবে। ফলে যথেচ্ছ মার্কেটিং ক্যাম্পেইনের শিকার আমাদের কম হতে হবে। আজ স্মার্টফোন যেমন সবার হাতে হাতে, তেমনি আগামী বছর দশেকের মধ্যে আমাজন ইকোর মতো অ্যাসিস্ট্যান্টও আমাদের সবার আবশ্যকীয় উপকরণে পরিণত হবে। আর এই নবযাত্রা ২০১৯-এ অনেক বেশি গতি পাবে।

-সিনিউজভয়েস ডেস্ক/

Please Share This Post.