প্রযুক্তিপ্রেমীদের বিশ্ব মিলনমেলা ও আমার অভিজ্ঞতা

মোবাইল ওয়ার্ল্ড কংগ্রেস বার্সেলোনা থেকে কাজী মোবাশ্বের হোসেন রুবেল-

তথ্যপ্রযুক্তি নিয়ে আগ্রহ আছে কিন্তু মোবাইল ওয়ার্ল্ড কংগ্রেস-এর নাম শোনেননি-এমন প্রযুক্তিপ্রেমী পৃথিবীতে আছেন কিনা জানি না। যতই দিন যাচ্ছে, এ নিয়ে আগ্রহী মানুষদের সংখ্যাও বাড়ছে। মোবাইল প্রযুক্তির এমন একটি বৈশ্বিক মিলনমেলায় অংশ নেয়ার সুযোগ পেলে গ্রহণ করবেন না- এমন মানুষ কতজন আছেন? খুবই কম। আমি সেই ভাগ্যবানদের একজন, যার সুযোগ ঘটেছিল ফেব্রুয়ারির ২৫ থেকে ২৮ তারিখ পর্যন্ত স্পেনের বার্সেলোনা শহরে অনুষ্ঠিত জিএসএমএ মোবাইল ওয়ার্ল্ড কংগ্রেস-এ অংশ নেয়ার। সি নিউজ-এর পাঠকদের সে অভিজ্ঞতার কথা জানানোর জন্যই কলম ধরেছি।

আপনারা জানেন, GSMA Mobile World Congress  বা সংক্ষেপে MWC হচ্ছে মোবাইল ইন্ডাস্ট্রিতে বিশ্বের সবচেয়ে বড় প্রদর্শনী। বৈশ্বিক মোবাইল অপারেটর, ডিভাইস নির্মাতা, প্রযুক্তি সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান, ভেন্ডর ও কনটেন্ট নির্মাতাদের বিশাল এই মিলনমেলার জন্য সারাবছর তৃষিতের মতো অপেক্ষা করেন সবাই।

অন্যান্য বছরের মতো ২০১৯ সালেও স্পেনের বার্সেলোনা শহরে অনুষ্ঠিত হয়ে গেল এই অসাধারণ ইভেন্টটি। স্প্রেফ মোবাইল প্রযুক্তিতে এখন আর সীমাবদ্ধ নয় এটি- MWC Barcelona নামে রিব্র্যান্ডিং করা এই ইভেন্ট এখন ‘মোবাইল’ শব্দটির ওপর থেকে মনোযোগ আরেকটু কমিয়ে দিয়ে যোগাযোগ তথা communications-এর বৃহত্তর প্রেক্ষাপটেই মনোযোগী হতে চাচ্ছে। সারাবিশ্বের আড়াই হাজারের কাছাকাছি কোম্পানির অংশগ্রহণে এই ইন্ডাস্ট্রির সমস্ত স্বপ্ন ও সম্ভাবনাকে বিশ্বের সামনে তুলে ধরার প্রচেষ্টাই কাজ করেছে এই মিলনমেলা আয়োজনের পেছনে।

এ বছরের মোবাইল ওয়ার্ল্ড কংগ্রেসের থিম ছিল- ইনটেলিজেন্ট কানেক্টিভিটি। নমনীয় ও দ্রুতগতির ফাইভ-জি নেটওয়ার্ক, ইন্টারনেট অব থিংস, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও বিগ ডাটার শক্তিশালী সমন্বয়ে মাধ্যমে যোগাযোগের দিগন্তকে আরো বিস্তৃত করাই এবারের সম্মেলনের মূল লক্ষ্যবস্থু ছিল। বলা হচ্ছে, বুদ্ধিমান সংযোগ বা Intelligent connectivity মাধ্যমে সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের যোগাযোগ অভিজ্ঞতা ব্যবহারকারীদের প্রদান করা সম্ভব, এবং সেটিও তাঁরা যখন চাইবেন তখন- যেখানে চাইবেন সেখানে। এটাই মোবাইল ইন্ডাস্ট্রির ভবিষ্যৎ গতিপথ নির্ধারণ করে দেবে।

ইন্টেলিজেন্ট কানেক্টিভিটির মধ্যে আটটি ‘কোর থিম’ নির্ধারণ করা হয়েছে যেগুলো এ বছরের কনফারেন্সের ফোকাস ছিল। এগুলো হলো: কানেক্টিভিটি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ইন্ডাস্ট্রি ৪.০, ইমার্সিভ কনটেন্ট, ডিসরাপ্টিভ ইনোভেশন, ডিজিটাল ওয়েলনেস, ডিজিটাল ট্রাস্ট এবং ভবিষ্যৎ। অসাধারণ এই গ্লোবাল ইভেন্টে অংশগ্রহণের সুযোগটি ছিল আমার জন্য বিশেষ কিছু। কনফারেন্সে অংশ নিয়ে খুব কাছ থেকে এর ব্যপ্তি এবং বিশ্বের প্রতিটি প্রান্ত থেকে যে বিপুল প্রতিনিধিত্ব তারা নিশ্চিত করেছে সেটি দেখে আমি সত্যিই চমৎকৃত হয়েছি। এত সুশৃঙ্খলভাবে এ আয়োজনটি সম্পন্ন হয়েছে এবং এই মেগা ইভেন্টটির জন্য সমস্ত অবকাঠামোগত সুবিধা ও লজিস্টিকস এমনভাবে নিশ্চিত করা হয়েছে যা আমার মতো অন্য সব অংশগ্রহণকারীকেই বিস্মিত ও মুগ্ধ করেছে।

এ বছর বিশ্বের ১৯৮টি দেশ ও অঞ্চল থেকে ১ লক্ষ ৯ হাজারের মতো অংশগ্রহণকারী এতে অংশ নিয়েছে। অংশগ্রহণকারীদের ৫৫ শতাংশই তাঁদের প্রতিষ্ঠানে বিভিন্ন জ্যেষ্ঠ পদে অধিষ্ঠিত আছেন- যাঁদের মধ্যে ছিলেন ৭৯০০ প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাও! ২৪০০-র মতো প্রতিষ্ঠান তাদের নতুন প্রযুক্তি, পণ্য ও সেবা প্রদর্শন করেছে প্রায় ১ লক্ষ ২০ হাজার বর্গফুট আয়তনের এই প্রদর্শনীতে, যেটি Fira Gran Via নামের ভেন্যুতে আয়োজিত হয়। এ বছর জিএসএমএ-র পক্ষ থেকে আরেকটি প্রশংসনীয় অন্তর্ভুক্তি ছিল ফেশিয়াল রিকগনিশন সার্ভিস BREEZ বা বায়োমেট্রিক রিকগনিশন ইজি এন্ট্রি জোন। এর মাধ্যমে আইডি কার্ড প্রদর্শন বা ব্যাজ স্ক্যান করা ছাড়াই স্বাচ্ছন্দে ভেন্যু এন্ট্রি পয়েন্ট বা রেস্ট্রিকটেড বিভিন্ন এলাকায় প্রবেশ করতে পেরেছেন অংশগ্রহনকারীরা। গোটা ভেন্যুতে ঝকঝকে তকতকে একটা ফ্রেশ লুক এসেছে সেটি সবার নজর কেড়েছে। অংশগ্রহণকারীরা আনন্দের সঙ্গে ঘুরে বেড়িয়েছেন কনফারেন্স ভেন্যুতে, প্রযুক্তির নতুন নতুন উদ্ভাবন দেখে ধন্য হয়েছেন।

এবছর মোবাইল ওয়ার্ল্ড কংগ্রেস-এ একশোর বেশি প্রযুক্তিগত ইভেন্ট আয়োজিত হয় যাতে ‘হাইপার কানেক্টিভিটি’র ধারণাকে নতুনভাবে উপস্থাপনা করা হয়। আগেই বলেছি, এবার আটটি কী টপিকের ওপর জোর দেয়া হয় এবং এগুলোর ওপর বিভিন্ন তথ্যমূলক সেশনের আয়োজন করা হয়। প্রযুক্তি ক্ষেত্রের বিশ্বসেরা সব ব্যক্তিত্ব এসব সেশনে নতুন প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন নিয়ে বক্তব্য রাখেন যা ছিল আমাদের, অর্থাৎ এসব সেশনে অংশগ্রহণকারীদের জন্য একটি বিশেষ প্রাপ্তি। আমি নিজে যেসব সেশনে অংশগ্রহণ করেছি সেগুলো হচ্ছে- Maintaining Consumer Trust in a Digital Economy, Cashing in on industrial data: Data exchanges, brokering and analytics, Linking IoT, 5G and Analytics in Smarter Enterprise, AI, Machine Learning and Your Access Network(s) এবং The Edge Computing Opportunity: Intelligent & Distributed।

আগেই বলেছি, বিশ্বের সেরা সব প্রযুক্তি স্বাপ্নিক ও নেতা এসব সেশনে আলোচনা করেন। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকজন হচ্ছেন আর্ম-এর সিইও সাইমন সেগারস, হুয়াওয়েই টেকনোলজিস-এর রোটেটিং চেয়ারম্যান গুয়ো পিং, জিএসএমএ-এর ডিরেক্টর জেনারেল ম্যাটস গ্র্যানরিড, এইচটিসি-র প্রতিষ্ঠাতা ও সিইও চের ওয়াং এবং ভোডাফোন গ্রুপ-এর সিইও নিক রিড।

আমার সবচেয়ে ভালো লেগেছে যখন বাংলাদেশের প্রযুক্তি ক্ষেত্রের প্রতিনিধিদের সাফল্যের সাথে এই কনফারেন্সে অংশ নিতে দেখেছি। ডাক টেলিযোগাযোগ ও তথ্য প্রযুক্তি মন্ত্রী মোস্তাফা জব্বারসহ সরকারি কর্মকর্তা ও প্রযুক্তি উদ্যোক্তারা এতে অংশ নিয়েছেন। এদের মধ্যে নিজেদের আইপি কল সিস্টেম প্রোডাক্ট নিয়ে অংশ নিয়েছিল বাংলাদেশি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান রিভ সিস্টেমস- যা আমাকে আনন্দিত করেছে।

বার্সেলোনা একটি অসাধারণ শহর- অনন্যসুন্দর শহর। বিভিন্ন মিটিং ও সেশনের ফাঁকে ফাঁকে ক্যাটালান সংস্কৃতির ঐতিহ্যধন্য বিভিন্ন খাবার উপভোগ করা ছিল একটি সুখকর অভিজ্ঞতা। আজ থেকে ঠিক এক বছর সময়ের মধ্যে আগামি ২৪-২৭ ফেব্রুয়ারি বার্সেলোনাতেই আয়োজিত হবে পরবর্তী মোবাইল ওয়ার্ল্ড কংগ্রেস। ২০১৯-এর সর্বাঙ্গসুন্দর আয়োজনের পর আগামি বছরের আয়োজনের দিকেই আপাতত তাকিয়ে আছেন মোবাইল এবং প্রযুক্তিপ্রেমীরা।

-সিনিউজভয়েস/জিডিটি/০৯এম/১৯

Please Share This Post.