প্রযুক্তি কি আমাদের নিয়ে যাচ্ছে নজরদারির সাম্রাজ্যে?

‘বিগ ব্রাদার ইজ ওয়াচিং ইউ’
‘১৯৮৪’ উপন্যাসে জর্জ অরওয়েল-এর কলম নিঃসৃত এ কথাগুলো তথ্যপ্রযুক্তির অভাবনীয় বিকাশের এ সময়ে নতুন করে প্রাসঙ্গিকতা পেয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী শীতল যুদ্ধের দিনগুলোতে এবং তারও পর দেশে দেশে সরকার কর্তৃক বিরোধীপক্ষ এবং যাদেরকে তারা বিপজ্জনক বলে মনে করে তাদের ওপর সার্বক্ষণিক নজরদারি এ কথাটির সত্যতার স্বীকৃতি দিত। এজন্য যে কেবল স্বৈরতান্ত্রিক দেশগুলোই দায়ী তাই নয়, অনেক গণতান্ত্রিক দেশও একই দোষে দোষী। বিশ্বজুড়ে গণতন্ত্রের অন্যতম পাহারাদার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বিরোধী পক্ষের ওপর আড়িপাতার জন্য রিচার্ড নিক্সনের পদত্যাগে বাধ্য হওয়ার ঘটনা এ সত্যেরই ইঙ্গিত দেয়। সাম্প্রতিক সময়ে সিআইএ-র সাবেক কর্মী এডওয়ার্ড  স্নোডেনের যুক্তরাষ্ট্রের দেশে বিদেশে নজরদারি সংক্রান্ত তথ্য ফাঁস এবং তারপর তার প্রাণ হাতে করে পালিয়ে বেড়ানোর ঘটনা তো বহুল আলোচিত। এ থেকে সরকার কর্তৃক নজরদারির বিপদাপদ সম্বন্ধে মানুষ নতুন করে সচেতন হয়েছে।

স্নোডেনের ঘটনা এখন থেকে বহুদিন বিশ্ব রাজনীতিই কেবল নয়, সামাজিক, নৈতিক, সাংস্কৃতিক ইত্যাদি ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলবে। তার কারণেই আমরা জানতে পারলাম, যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল সিকিউরিটি এজেন্সি কোটি কোটি মানুষের ফোন রেকর্ড, অনলাইন সার্চ ও ইমেলসহ ব্যক্তিগত কর্মকান্ডে সার্ভেইল্যান্স বা সোজা বাংলায় বললে আড়ি পাতার কাজটি করে আসছে। সেদেশের সরকার যতই বলুক, যতটা নজরদারির কথা বলা হচ্ছে  আদতে তারা তা করেনি এবং যা করেছে তাও কেবল রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার স্বার্থে, তাদের কথা কেউ বিশ্বাস করছে বলে মনে হচ্ছে না। রাজনীতির তর্ক রাজনীতির মাঠেই থাকুক, কিন্তু একই সঙ্গে আরেকটি বিষয়ও এখানে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দেখা দিয়েছে। তা হচ্ছে  প্রযুক্তির অভাবনীয় অগ্রগতির কারণেই এত সহজে এত বেশি মানুষের ওপর নজর রাখা সম্ভব হচ্ছে । প্রযুক্তির অগ্রগতির কারণেই সময় ও স্থানের তথ্য সংবলিত ফোন নম্বরকে ওয়েব সার্চের সঙ্গে একত্রিত করে তার সঙ্গে টেক্সট মেসেজের তথ্যাবলীকে মিলিয়ে আপনি কোথায় আছেন আর কী করছেন তার একটি স্পষ্ট ধারণা পাওয়া হচ্ছে । আপনার সম্বন্ধে কেউ যদি সব কিছুই জানে তাহলে আপনি ফোনে কাকে কী বলছেন সেটা জানার গুরুত্ব অনেকটাই কমে যায়। যেমন, আপনি চরমপন্থীদের  সংগঠনে মাসে মাসে মোটা চাঁদা দেন এবং স্থানীয় এক চরমপন্থী নেতার কাছে প্রতিদিন একাধিক মেসেজ পাঠান, এটি জানার পর আপনার সম্বন্ধে আর বেশি কিছু জানার বাকি থাকে কি?

আমরা আমাদের অবস্থান, কেনাকাটা, ব্যাংকিং তথ্য ও ব্যক্তিগত সম্পর্কের তথ্য প্রতি মুহূর্তে নানা নেটওয়ার্কের মাধ্যমে প্রচার করে যাচ্ছি। প্রযুক্তির উন্নতির কারণে এগুলো কেউ চাইলেই জেনে নিতে পারছে। সরকারগুলো চাইলেই স্বয়ংক্রিয় স্ক্যানিং সফটঅয়্যারের সাহায্যে তার প্রতিটি নাগরিকের গতিবিধি মনিটর করতে পারে, প্রতিটি দিন, প্রতিটি মুহূর্ত। আপনার ফুটপাথ ধরে হেঁটে যাওয়ার দৃশ্য মনিটর করবে ভিডিও ক্যামেরা, টোল ট্যাগ আর অন বোর্ড কানেক্টেড কার সিস্টেম আপনার গাড়িতে থাকার সময়টা নজরদারি করবে, এমনকি আপনি ক’বার ব্রেক চাপলেন আর বেশি গতিতে গাড়ি চালালেন ক’বার তাও। একইভাবে সিকিউিরিটি সিস্টেমগুলো লুকানো সফটঅয়্যার ও কিবোর্ডে ট্র্যাকিংয়ের মাধ্যমে অফিসে অফিসে প্রতিটি কর্মীর কম্পিউটার ব্যবহারের অভ্যাস ও কার্যক্রম মনিটর করবে। বাড়িতে ফিরেও কি নিস্তার আছে? স্ট্রিমিং সার্ভিস সংবলিত স্মার্ট টিভি আপনি টিভিতে কী দেখছেন তার খোঁজখবর নিতে থাকবে। কোনো কোনো টিভি সেট আর গেমিং কনসোলে লুকানো থাকে ক্যামেরা যার সাহায্যে জেনে নেয়া যায় টিভি বা কনসোলটির সামনে কে বসে আছে! এখন তো স্মার্টফোনের ওপর আমাদের বাড়াবাড়ি নির্ভরতার কারণে আমাদের অবস্থান, কেনাকাটা, ব্যাংকিং তথ্য ও ব্যক্তিগত সম্পর্কের সমস্ত খোঁজখবর খুব সহজেই নিয়ে নেয়া যাবে। সেটা সরকার করতে পারে, আবার ম্যালঅয়্যারের মাধ্যমে করতে পারে হ্যাকাররাও। ফ্লেইম নামে একটি কম্পিউটার প্রোগ্রাম আছে যেটি মূলত এসপিওনাজের উদ্দেশ্যেই তৈরি করা হয়েছে। এ প্রোগ্রামটি কোনো ডিভাইসে থাকা মাইক্রোফোনকে চালু করতে এবং তারপর কথাবার্তা রেকর্ড করতে পারে। গুগল গ্লাস (Google Glass) নিয়েও অনেক কথা শোনা যাচ্ছে। গুগলের এই চশমা এখনও সর্বসাধারণের ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত হয়নি বটে, তবে যখন হবে তখন আর ছবি তোলার জন্য চোখের সামনে ফোন বা ক্যামেরা ধরার দরকার হবে না, চোখের পলক ফেলেই ভিডিও রেকর্ড করা যাবে। গুগলের ফাউন্ডার ল্যারি পেইজ সম্প্রতি গুগলের শেয়ারহোল্ডারদের এক মিটিংয়ে পাবলিক বাথরুমে গুগলগ্লাস ব্যবহার করে মানুষ ছবি তুলে ফেলবে এ ভয়ে তটস্থ না থাকার আহ্বান না জানিয়ে বলেছেন, স্মার্টফোন দিয়ে মানুষ বাথরুমে ছবি তুলে ফেলবে এ ভয় যদি আমরা না পাই তাহলে গুগলগ্লাসকেও ভয় পাবার কিছু নেই।

আসলে প্রযুক্তি নিয়ে ভয় অন্য কোনো জায়গায় নয়, ভয় এর শক্তিমত্তা এবং গোপনে কাজ করার ক্ষমতাকে। এর মানে হল, যে সব তথ্যকে আপনি একান্তই নির্দোষ বলে মনে করেন সেগুলোকেও আপনার অজান্তে আপনার বিরুদ্ধে ব্যবহার করা যাবে। আপনি জানতেও পারবেন না কেন আপনার চাকুরির আবেদন প্রত্যাখ্যাত হল বা আপনার বাচ্চাকে কেন নির্দিষ্ট কোনো স্কুলে ভর্তি করতে অস্বীকৃতি জানানো হল। ধরুন, গাড়ি চালানোর সময় হঠাৎ দুজন পুলিশ অফিসার এসে আপনাকে আটকাল, তারপর নানা ‘কাল্পনিক’ অভিযোগ তুলে হয়রানি করতে থাকলেন আপনাকে। আপনার জানাও নেই, এর মূল কারণ হচ্ছে, আপনার গাড়ির লাইসেন্স প্লেটের ছবি তুলেছে একটি লাইসেন্স প্লেট রিডার (এলপিআর) ক্যামেরা, এবং তারপর বিশেষ একটি অ্যালগোরিদমের ওপর ভিত্তি করে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছে যে, এই প্লেট নাম্বারের সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যক্তিটি একটি সন্দেহজনক সংগঠনে চাঁদা দিয়েছে এবং বিশেষ কোনো দেশে কয়েকবার ফোন করেছে। এবার এক দফা হয়রানির পর পুলিশ অফিসারেরা আপনাকে ছেড়ে দিল বটে, তবে এক সপ্তাহ পর ঘটনাটি আবার ঘটল এবং তার পরের সপ্তাহে আবার। বুঝতেই পারছেন, অনলাইন নজরদারির বিপদটা ঠিক কোথায়!

কাজেই মোদ্দা কথা দাঁড়াচ্ছে, আপনি কোনো ভুল অথবা অপরাধ না করেও, কখনো কোনো নিয়ম ভঙ্গ না করেও, শুধুমাত্র কিছু তথ্যের কারণে নানারকম হয়রানি এবং বিপদের সম্মুখীন হতে পারেন। প্রযুক্তির এ ধরনের ব্যবহারের কারণ হিসেবে সন্ত্রাসীদের পাকড়াও করার কথা বলা হয় বটে, কিন্তু ভুল বা উদ্দেশ্যমূলকভাবে ব্যবহৃত হলে এ থেকে ঘটতে পারে চরম অনাকাক্সিক্ষত পরিণতি।
এ ধরনের ঘটনা যাতে না ঘটে তার সিদ্ধান্ত নিতে হবে আসলে সরকারগুলোকেই। প্রযুক্তি আমাদের জীবনে আছে থাকবে। কাজেই এখন দরকার প্রযুক্তির নৈতিক ও যথাযথ ব্যবহার। সেটি যত স্বচ্ছ ও কার্যকরভাবে ব্যবহার করা যাবে, সমাজ ও রাষ্ট্র ততই সুন্দর ও শান্তিপূর্ণ হবে।
সূত্র: ফক্সনিউজ-এ জন আর. কুইনের নিবন্ধনের অবলম্বনে

সিনিউজভয়েস//ডেস্ক/

 

Please Share This Post.