দেশে প্রথমবারের মতো নারীদের জাতীয় হ্যাকাথন অনুষ্ঠিত

দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ৫২৩ জন নারীর অংশগ্রহণের মধ্যে দিয়ে প্রথমবারের মতো আয়োজিত দুই দিনব্যাপী ‘ন্যাশনাল হ্যাকাথন ফর উইমেন-২০১৭’ শনিবার বিকেলে (১১ ফেব্রুয়ারি) শেষ হয়েছে।

এর আগে, শুক্রবার সকালে রাজধানীর ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউটে জমকালো আয়োজনের মধ্যে দিয়ে শুরু হয় দুই দিনব্যাপী ‘ন্যাশনাল হ্যাকাথন ফর উইমেন-২০১৭’।

প্রথমবারের মতো আয়োজিত দুই দিনব্যাপী এ জাতীয় হ্যাকাথনে অংশগ্রহণকারীরা দেশের আইসিটি খাতে স্বনামধন্য কোডিং ও সফটওয়্যার ডেভেলপারদের সহযোগিতায় আয়োজকদের নির্ধারিত ৯টি খাতে দেশে বিদ্যমান বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে সফটওয়্যার আইডিয়া ডেভেলাপ করেছেন।

এই ৯ টি খাতের মধ্যে, স্বাস্থ্য ও কল্যাণ, কৃষি ও পরিবেশ, ব্যবসা ও বাণিজ্য, দক্ষতা অর্জন ও শিক্ষা, সংস্কৃতি ও পর্যটন, গণমাধ্যম ও বিনোদন, নগরায়ন, সুপরিকল্পিত বাসস্থান এবং অধীনতা ও ক্ষমতায়ন। এ প্রতিযোগিতা শেষে প্রত্যাকটি খাতে আলাদা আলাদা তিনটি করে মোট ২৭টি পুরস্কার দেওয়া হয়েছে।

এর মধ্যে স্বাস্থ্য ও কল্যাণ খাতে প্রথম হয়েছে অপটিমিস্ট, কৃষি ও পরিবেশখাতে গ্রীণওয়াল্ড, ব্যবসা ও বাণিজ্য খাতে সিইউ স্প্রীং, দক্ষতা অর্জন ও শিক্ষা খাতে জুুবিয়েল গার্ল, সংস্কৃতি ও পর্যটন খাতে ট্রাসপেক্ট ০.২, গণমাধ্যম ও বিনোদনে ইনভিজিবল ফাইটারস, নগরায়ন ও সুপরিকল্পিত বাসস্থান খাতে ক্রিস্টোন এবং অধীনতা ও ক্ষমতায়ন খাতে মিস্ট কার্ডিনাল প্রথম স্থান অধিকার করছে। এছাড়া প্রত্যেক খাতে দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থান অধিকারীদের পুরষ্কিত করা হয়েছে।

আইসিটি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক বিজয়ীদের মধ্যে পুরষ্কার বিতরণ করেন। প্রত্যেক চ্যাম্পিয়নকে ৫০ হাজার, প্রথম রানারআপ ৩০ হাজার এবং দ্বিতীয় রানারআপ ২০ হাজার টাকা করে প্রদান করা হয়।

অনুষ্ঠানে জুনাইদ আহমেদ পলক বলেন, হ্যাকাথনের প্রত্যেকটি প্রজেক্টকে ব্যবসায় রূপান্তরিত করতে আইসিটি বিভাগ থেকে প্রয়োজনী সকল সহায়তা দেওয়া হবে। তিনি মেয়েদের উদ্ভাবনী প্রজেক্ট নিয়ে কাজ করার আহবান জানান।

আইসিটি ডিভিশন ও ‘উইমেন ইন ডিজিটাল বাংলাদেশ’ যৌথভাবে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা প্রায় ৫২৩ নারী অংশগ্রহণকারীকে নিয়ে এ হ্যাকাথনের আয়োজন করেছে।
বর্তমানে বাংলাদেশের আইসিটি খাতে নারীদের অবদান উল্লেখযোগ্য হওয়া সত্ত্বেও দেশের সকল প্রান্তের নারীদের একই সঙ্গে আইসিটির অঙ্গনে যুক্ত করার জন্য এর আগে কোনো আয়োজন করা হয়ে ওঠেনি। দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রায় ১৪৭০ নারী প্রথমবারের মতো আয়োজিত এই হ্যাকাথনে অংশগ্রহণের জন্য নিবন্ধন করেন। ৩৬ ঘণ্টাব্যাপী এই আয়োজনে নারীরা ৩৭টি গ্রুপে ভিন্ন ভিন্ন ৯টি ক্ষেত্রে বিভিন্ন সমস্যার সমাধানকে বাস্তবায়নের প্রতিযোগিতায় মেতে উঠেন।

১০ ফেব্রুয়ারি শুক্রবারের, উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ সরকারের আইসিটি মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক। এ অনুষ্ঠানে আরো উপস্থিত ছিলেন বেসিস সভাপতি মোস্তাফা জব্বার, বেসিস সহ-সভাপতি ফারহানা এ রহমান, সাবেক বেসিস সভাপতি শামীম আহসান, তথ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. হারুনুর রশিদ, উইমেন ইন ডিজিটাল উপদেষ্টা আবদুল খায়ের পাটোয়ারী,  উইমেন ইন ডিজিটাল প্রতিষ্ঠাতা আছিয়া খালেদা নীলা সহ আরো অনেকে।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে জুনাইদ আহমদে পলক বলেন, জননেত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনায় ‘ভিশন-২০২১’ বাস্তবায়নে আইসিটি ক্ষেত্রে সক্ষমতা অর্জনের লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে আইসিটি মন্ত্রণালয়। বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো আয়োজিত দুইদিনব্যাপী এ ‘ন্যাশনাল হ্যাকাথন ফর উইমেন-২০১৭’ বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে, বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও উপজেলা পর্যায় থেকে আসা নারী ডেভেলপাররা এই স্বপ্নের বাস্তবায়নে সহায়তা করবে।

তিনি বলেন, বর্তমান সরকার এমন একটি এজেন্ডা নিয়ে কাজ করছে যার লক্ষ্য হলো ইনক্লোসিভ উন্নয়ন। আর আইসিটির উন্নয়ন সকল মানুষের জন্য। যে উন্নয়নে নারী ও পুরুষের সমান অংশগ্রহণ থাকবে। শুধু স্বাস্থ্য সেবা, নিরাপত্তা ও সামাজিক যোগাযোগের জন্য ইন্টারনেট ব্যবহার করবে তা নয়। আমরা চাচ্ছি নারীরা নতুন নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবন করবে, বিভিন্ন সফটওয়্যার তৈরি করবে। এখানে এই হ্যাকাথনে যে নয়টি সেক্টর নিয়ে প্রতিযোগীতার আয়োজন করা হয়েছে এ নয়টি সেক্টরে যে সকল সমস্যা আছে তার প্রযুক্তিগত সমাধান আনা যায় তা উদ্ভাবন করবে।

তিনি বলেন, বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব, বেগম রোকেয়া ও সুফিয়া কামাল এ তিনজন যখন নারী জাগরণের ডাক দিয়েছিল তখনকার সমাজে পড়াশোনা থেকে শুরু করে বিভিন্ন ক্ষেত্রে এতো মেয়েদের অংশগ্রহণ ছিল না। তখন বিনা মূল্যে বই ছিল না, কম্পিউটার ছিল না, ইন্টারনেট ছিল না। এখন বিনা মূল্যে বই দেওয়া ও বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা দেওয়ার ফলে সারা দেশে ছেলেদের তুলনায় মেয়েদের অংশগ্রহণের পরিমান বেশি। বর্তমান সরকার ১৯৯৬ তে সরকার থাকাকালীন সময়ে প্রথম কম্পিউটার আমদানি ট্যাক্সমুক্ত করেছিল। আগে যেখানে ১ এমবিপিএস ইন্টারনেট এর মূল্য ৭৮,০০০ টাকা থেকে ৪০০ টাকায় নিয়ে এসছে। যা তথ্য প্রযুক্তিখাতের উন্নয়নে বিশাল ভুমিকা রাখছে। প্রতিটি স্কুলে ছাত্র-ছাত্রীদের প্রযুক্তি বিষয়ে শিক্ষিত করে তোলার জন্য শেখ রাসেল কম্পিউটার স্থাপন করা হচ্ছে। নারীদেরকে প্রযুক্তিতে পারদর্শি করে তোলতে আগামী দুই বছরে সারা দেশের মোট দুই লক্ষ নারীকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার কাজ করে যাচ্ছে। এছাড়া সারাদেশে ঘুরেঘুরে প্রযুক্তি ক্ষেত্রে টেকশই নারী উন্নয়নে কাজ করে যাবে ৭টি প্রযুক্তি বাস।

পলক আরো বলেন, আগামী ২০২১ সালের মধ্যে ১০০০ টি ইনোভেটিভ প্রযুক্তি উদ্ভাবনের জন্য প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে। যার মধ্যে প্রথম দুই বছরে কমপক্ষে ২০০টি সফটওয়্যার উন্নয়ন করা হবে যার জন্যে প্রথম চারমাসে ১ কোটি টাকা অনুদানের ড্রাফট শেষ হয়েছে। এছাড়া ২০১৭ সালের মধ্যে উইমেন ইন আইসিটি ফর ইনিশিয়েটিভ চালু করা হবে যার আওতায় আগামী কয়েক বছরে আরো ১ লক্ষ নারী উদ্যোক্তাকে প্রশিক্ষত করে তোলা হবে।

অনুষ্ঠানে বেসিস সভাপতি মোস্তাফা জব্বার বলেন, আমাদের মেয়েদের যেকোনো কিছু অর্জন করে নেবার ক্ষমতা আছে। তারা খুব অল্পতেই কোনো বিষয় বুঝে নিতে পারে। এ জন্যে বাংলাদেশের সবচেয়ে যে বড় পরিবর্তন এসেছে তা হলো শিক্ষা ক্ষেত্রে নারীদের অংশগ্রহণ। তথ্য প্রযুক্তিতেও নারীরা তাদের সরব অংশগ্রহণ নিশ্চিত করবে বলেই আমি মনে করি।

অনুষ্ঠানে উইমেন ইন ডিজিটাল প্রতিষ্ঠাতা আছিয়া খালেদা নীলা বলেন, বাঙালী নারীর সৃজনশীলতাকে প্রোগ্রামিং ও উদ্ভাবন দেশের উন্নয়নে নতুন মাত্রা যোগ করবে।

 

– সিনিউজভয়েস ডেস্ক

Please Share This Post.