ডিসপ্লে প্রযুক্তির নতুন ধারা: হেপটিকস

মনিটর বা ডিসপ্লে প্রযুক্তির ভুবনে নতুন একটি ধারার সৃষ্টি করেছে হ্যাপটিকস (Haptics)। শব্দটা শুনতে নতুন মনে হলেও আসলে আমরা কিন্তু বেশ অনেকদিন ধরে হ্যাপটিকস প্রযুক্তি ব্যবহার করে আসছি। মোবাইল ফোনে ভাইব্রেশন হলে সেটি কাঁপতে থাকে, এটাও এক ধরনের হ্যাপটিকস প্রযুক্তি। অর্থাৎ হ্যাপটিকস মানে হচ্ছে স্পর্শের মাধ্যমে যন্ত্রের সাড়া অনুভব করতে পারা। এখানেই টাচ সেনসিটিভ বা স্পর্শ সংবেদী প্রযুুক্তির সঙ্গে এর অমিল। টাচ সেনসিটিভ প্রযুক্তিতে স্পর্শের দ্বারা নির্দেশ বা ইনপুট দেয়া যায় বটে, তবে হাতের মধ্যে কিন্তু কোনো কিছু অনুভব করা যায় না। এখানেই হ্যাপটিকস অন্য রকম। এতে হাতের মধ্যেও কম্পিউটারের সাড়া অনুভব করা যায়। অর্থাৎ ডিসপ্লের ওপর হাত দিলে সেটি কাঁপবে বা কোনোভাবে আন্দোলিত হবে এবং ব্যবহারকারী তা স্পষ্ট বুঝতে পারবেন। সম্প্রতি হ্যাপটিক প্রযুক্তি নিয়ে মোবাইল ও স্মার্টফোন নির্মাতাদের মধ্যে নতুন ধরনের আগ্রহের সৃষ্টি হয়েছে। অল্প কিছুদিনের মধ্যে ২০টিরও বেশি মোবাইল ফোনের মডেল এসেছে হ্যাপটিকস প্রযুক্তির উপর ভিত্তি করে। এর মধ্যে নকিয়া এন৮ এবং স্যামসাং গ্যালাক্সি এস সিরিজের কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করতে হয়। কারণ এ দুটো ফোনের টাচ স্ক্রিনের মাধ্যমে ইন্টার‌্যাক্ট করার ব্যাপারটাকে নতুন এক মাত্রায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে। নতুন হ্যাপটিকস প্রযুক্তির কারণে এসব ফোনের টাচস্ক্রিন ব্যবহার করে ভিন্ন ধরনের এক আনন্দ পাবেন ইউজাররা।

haptics
সাইনাপটিক্সের ফিউজ কনসেপ্ট ফোনে হ্যাপটিক ফিডব্যাক দেয়ার কাজে ব্যবহৃত হয় ইমারসনের মেকানিক্যাল অ্যাকচুয়েটর সিস্টেম

এ ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের সান্তা ক্লারাভিত্তিক ‘ডিসপ্লেসার্চ’ নামে একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের বিশ্লেষক জেনিফার কোলগ্রোভ বলেন, হ্যাপটিকস ডিসপ্লের ভুবনে নতুন এক ধারার সৃষ্টি করতে যাচ্ছে। মোবাইল ফোনের অঙ্গন পেরিয়ে এটি দ্রুতই ট্যাবলেট পিসির জগতেও পা রাখবে বলে তিনি ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন। এরই মধ্যে হ্যাপটিকসভিত্তিক যে ট্যাবলেট পিসিটি সবার মনোযোগ আকর্ষণ করেছে সেটি হচ্ছে স্যামসাং গ্যালাক্সি ট্যাব। গত বছরের সেপ্টেম্বরে বাজারে আসার পর এরই মধ্যে এই ট্যাবলেট পিসিটির প্রায় ২০ লক্ষ কপি বিক্রি হয়ে গেছে। হ্যাপটিকসের একটি বড় ধরনের সুবিধা হচ্ছে, এটির সাহায্যে স্মার্টফোন বা ট্যাবলেট পিসিতে ভার্চয়াল কিবোর্ডের ব্যবহার কার্যকরভাবে করা যাবে। এ ব্যাপারে গবেষণা প্রতিষ্ঠান ফ্রস্ট অ্যান্ড সুলিভানের বিশ্লেষক অমৃতা শ্রীধরণ বলেন, ‘ভার্চুয়াল কিবোর্ডে হ্যাপটিকস সুবিধা না থাকলে কিবোর্ড চাপার ক্ষেত্রে অনেক বেশি ভুল হয়। হ্যাপটিকসের কলাণে ব্যবহারকারী বুঝতে পারবেন তিনি ঠিক জায়গাতেই চাপ দিয়েছেন বা ঠিক কমান্ডটিই দিয়েছেন কি না।’

নতুন নতুন যেসব হ্যাপটিকস প্রযুক্তি আসছে সেগুলো আসলে স্রেফ ভাইব্রেট করার চাইতে আরো অনেক বেশি কাজ করতে পারে। এরা কোনো ডিসপ্লের উপরিভাগে (সারফেস) নানারকম স্পর্শানুভূতি এনে দিতে পারে। যেমন, ইচ্ছে করলে এমন ব্যবস্থা করা যায়, একবার স্পর্শ করলে ব্যবহারকারী খসখসে ভাব পাবেন, পরক্ষণেই পাবেন ভেজা ভেজা বা পিচ্ছিল ভাব। অবশ্য হ্যাপটিকসের একটা নেতিবাচক দিক হচ্ছে এটি টাচস্ক্রিনের ওপর বসে কাজ করে। এর মানে হচ্ছে ডিসপ্লের উপর হ্যাপটিকসের জন্য নতুন একটি লেয়ার সৃষ্টি করতে হয়। অর্থাৎ ব্যবহারকারীর চোখ আর মিডিয়া, এ দুটোর মধ্যে দু-দুটো লেয়ার সৃষ্টি হওয়া, ফলে স্ক্রিনের ব্রাইটনেস কমে যেতে পারে।

এ প্রযুক্তি এরই মধ্যে কনিজউমার ইলেকট্রনিক্স সেক্টরেও পৌঁছে গেছে। সামনের দিনগুলোতে হ্যাপটিকস প্রযুক্তিতে নতুন নতুন অগ্রগতির কল্যাণে গাড়ি ও গৃহস্থালী পণ্যের বাজারেও এটি পৌঁছে যাবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। এ মুহূর্তে হ্যাপটিকসের ভুবনে সবচেয়ে বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে একটি হচ্ছে ইমারসন কর্পোরেশন। তাদের তৈরি মেকানিক্যাল অ্যাকচুয়েটর সিস্টেম (হ্যাপটিকস-এর পেছনের আসল প্রযুক্তি) এলজি, নকিয়া ও সামসাংয়ের মত বড় বড় প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যবহার করে। ইমারসন-এর ভাইস প্রেসিডেন্ট ডেনিস শিহান জানিয়েছেন, তাদের ডিজাইনে তৈরি হ্যাপটিকস প্রযুক্তি ব্যবহার করে এলজি, নকিয়া ও স্যামসাং এ পর্যন্ত প্রায় ২০ কোটি ফোন বাজারে ছেড়েছে। তোশিবা তাদের ডুয়াল স্ক্রিন লিব্রেটো ডব্লু১০০ কনসেপ্ট ল্যাপটপে এটি ব্যবহার করছে। আর সাইনাপটিক্স নামে একটি কোম্পানি তাদের ফিউজ কনসেপ্ট ফোনে টাচ ডায়ালিং ও নেভিগেশনের জন্য ব্যবহার করছে হ্যাপটিকস প্রযুক্তি। ইমারসনের হ্যাপটিকস প্রযুক্তির পেছনের কনসেপ্টটি আসলে খুবই সহজ সরল। বেশির ভাগ সেলফোনের মধ্যেই একটি স্পিনিং মোটর আছে। ফোনটি সাইলেন্ট মোডে চলে গেলে সেটিকে ভাইব্রেট করা সহজ হয় এমন একটি অবস্থানে মোটরটি বসানো আছে। ইমারসনের সফটঅয়্যার এই মোটরকে নিয়ন্ত্রণ করার মাধ্যমে ভিন্ন ভিন্ন ধরনের ভাইব্রেশন প্যাটার্ন সৃষ্টি করে। ইমারসনের প্রযুক্তিনির্ভর বতমান প্রজন্মের স্মার্টফোনগুলো কয়েকটি মৌলিক ভাইব্রেশন প্যাটার্নই শুধু বাস্তবায়ন করতে পারে। তবে অগ্রসর প্রযুক্তি ব্যবহার করে অল্প দিনের মধ্যে ভাইব্রেশনের ধরনকে ভিন্ন পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া হবে। পর্দার ওপর বিভিন্ন টেক্সচারকে অনুকরণ করার জন্য ভাইব্রেশন ফ্রিকোয়েন্সিকে আরো অনেক পরিশীলিত করা যাবে এর মাধ্যমে। এছাড়া স্ক্রিনের ভিন্ন ভিন্ন এলাকায় ভিন্ন ভিন্ন অনুভূতিও সৃষ্টি করা যাবে। হ্যাপটিকসের জগতে ইমারসনের একেবারে নতুনতম সিস্টেম হচ্ছে টাচসেন্স ৫০০০। এটি পায়েজো অ্যাকচুয়েটর (piezo actuators) নামে এক ধরনের সিরামিক ডিভাইস ব্যবহার করে যেটি বিদ্যুতের সংস্পর্শে এসে নড়াচড়া শুরু করে। এর মাধ্যমে ব্যবহারকারীদেরকে একেবারে ভিন্ন ধরনের স্পর্শানুভূতি দেয়া যাবে বলে মনে করেন ইমারসনের প্রকৌশলীরা। স্ক্রিনের ওপর হাত বোলানোর সময় প্রতিবারের নড়াচড়াতেই নতুন নতুন অনুভূতি পাবেন ব্যবহারকারী। অথবা আঙ্গুল বোলানোর মাধ্যমে দ্রুতগতির অনুভূতিও তিনি অর্জন করতে পারবেন, যেসব অ্যাপ্লিকেশনে ভাচুয়াল স্লাইডার নিয়ন্ত্রণ করতে হয় সেখানে এই অনুভূতি অনেক কাজে আসতে পারে। আবার একেবারে ভিন্ন ধরনের অনুভূতিও সৃষ্টি করা সম্ভব। ভাইব্রেশন ও ফ্রিকশন প্যাটার্নের সমন্বয়ে ইলেকট্রোমেকানিক্যাল অ্যাকচুয়েটর ব্যবহার করে খসখসে বা পিচ্ছিল ভাবের সৃষ্টি করা যাবে। ফলে স্ক্রিনের ওপর হাত দিয়ে ব্যবহারকারীর মনে হবে তিনি আসলেই ময়দার গুঁড়ো, পানি, বালু ইত্যাদির ওপর হাত বোলাচ্ছেন।

এ ধরনের অগ্রসর প্রযুক্তির দাম এ মুহূর্তে একটু বেশিই হবে। তবে সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে অল্পদামের ফোনেও প্রয়োগ করা যাবে নানা ধরনের হ্যাপটিকস প্যাটার্ন। সে সময়ও আর খুব বেশি দূরে নয়।

সিনিউজভয়েস//ডেস্ক/
৬.৪ ইঞ্চি সুপার অ্যামোলেড কোয়াড এইচডি’র ফ্যাবলেট উন্মোচন
প্রযুক্তি কি আমাদের নিয়ে যাচ্ছে নজরদারির সাম্রাজ্যে?

 

Please Share This Post.