ডিজিটাল ওয়ার্ল্ড ২০১৬ উদ্বোধন

‘ডিজিটাল বিশ্বে নন-স্টপ বাংলাদেশ’ এই প্রতিপাদ্যে রাজধানীতে শুরু হয়েছে তিন দিনব্যাপী ডিজিটাল ওয়ার্ল্ড ২০১৬। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বুধবার দুপুরে বসুন্ধরা আন্তর্জাতিক কনভেনশন সিটিতে এই মেলার উদ্বোধন করেন। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক।

চতুর্থবারের মত আয়োজিত এই তথ্যপ্রযুক্তি মহাসম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘ডিজিটাল সুবিধা ব্যবহার করে কেউ যেন অপরাধ কার্যক্রম চালাতে না পারে সে ব্যবস্থাও আমাদের নিতে হবে।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ডিজিটালাইজেশনের সঙ্গে সঙ্গে নিরাপত্তা সংক্রান্ত কিছু সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে। সাইবার সিকিউরিটি বিষয়ে আমাদের সক্ষমতা বাড়াতে হবে। বিশেষ করে আর্থিক খাত এবং গোপনীয় বিষয়ের নিরাপত্তা যাতে কোনোভাবেই বিঘ্নিত না হয়, সে বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে।’ এ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এ বিষয়ে জনসম্পদ তৈরি এবং প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি সংগ্রহ করা হবে।

আইসিটি প্রতিমন্ত্রী জুনায়েদ আহমেদ পলকের সভপতিত্বে অনুষ্ঠানে আরো বক্তৃতা করেন ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্য প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি ইমরান আহমেদ, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মহাপরিচালক (প্রশাসন) ও অ্যাক্সেস টু ইনফর্মেশন (এটুআই) কর্মসূচির পরিচালক কবির বিন আনোয়ার, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের সচিব শ্যাম সুন্দর শিকদার এবং বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফর্মেশন সার্ভিসেস (বেসিস) সভাপতি মোস্তফা জব্বার।

ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে তাঁর সরকার শিক্ষাখাতকে অধিক গুরুত্ব দিয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ৬ষ্ট থেকে দ্বাদশ শ্রেণী পর্যন্ত তথ্যপ্রযুক্তি শিক্ষা বাধ্যতামূলক করেছি। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ১ম থেকে ৫ম শ্রেণি পর্যন্ত ১৭টি টেক্সট বইকে ডিজিটাল টেক্সটবুক বা ই-বুকে রূপান্তর করেছি। শিক্ষা ব্যবস্থাকে বিশ্বমানে উন্নীত করতে আমরা সারাদেশে ৩০ হাজার মাল্টিমিডিয়া ক্লাস রুম স্থাপন করেছি।

সারাদেশে ২ হাজার ১টি ‘শেখ রাসেল ডিজিটাল ল্যাব’ স্থাপন করেছি। আরও ৯০০টি ল্যাব প্রতিষ্ঠার কাজ শেষের পথে। ৬৪ জেলায় ৬৫টি ল্যাংগুয়েজ ল্যাব প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। সব মিলিয়ে দেশে সাড়ে ৫ হাজারেরও অধিক ডিজিটাল ল্যাব স্থাপন করেছি। তিনি বলেন, ২০১৮ সালের মধ্যে আরও ১০ হাজার ‘শেখ রাসেল ডিজিটাল ল্যাব’ স্থাপন করা হবে। আইসিটি খাতে গবেষণার জন্য ফেলোশিপ ও বৃত্তি প্রদান এবং উদ্ভাবনীমূলক কাজের জন্য অনুদান সম্পর্কিত নীতিমালা-২০১৩ প্রণয়নের মাধ্যমে আমরা ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’এর শক্ত ভিত্তি তৈরি করেছি-উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, উদ্ভাবনী কর্মকান্ডকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে এবং আইটি স্টার্ট-আপ উদ্যোগকে সম্প্রসারণ করতে তাঁর সরকার ‘ইনোভেশন ডিজাইন এন্টারপ্রেনারশীপ একাডেমী (আইডিইএ) প্রকল্প অনুমোদন দিয়েছে। পাশাপাশি উদ্ভাবনকে গুরুত্ব দিয়ে আমরা ‘ওয়ান থাউজেন্ড ইনোভেশন-২০২১’ নামের এক বিস্তৃত কর্মযজ্ঞও শুরু করেছে।
এছাড়া, গেমিং শিল্পে বাংলাদেশকে বিশ্ব দরবারে প্রতিষ্ঠা করতে ‘স্কিল ডেভেলপমেন্ট ফর মোবাইল গেম অ্যান্ড অ্যাপলিকেশন’ প্রকল্পও গ্রহণ করেছে।

প্রধানমন্ত্রী দেশের বর্তমান আর্থসামাজিক উন্নয়নের প্রসঙ্গ তুলে ধরে বলেন, বাংলাদেশ আজ বিশ্বে উন্নয়নের রোল মডেল। বর্তমানে প্রবৃদ্ধি ৭ দশমিক ০৫ শতাংশ। মাথাপিছু আয় ১ হাজার ৪৬৬ মার্কিন ডলার। ৫ কোটি মানুষ নিম্ন আয়ের স্তর থেকে মধ্যম আয়ের স্তরে উন্নীত হয়েছে। দারিদ্র্যের হার আমরা ২২ দশমিক ৪ শতাংশে নামিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছি।

প্রধানমন্ত্রী দেশের আইসিটি শিল্পের বিকাশে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর অবদানের কথা স্মরণ করে বলেন, জাতির পিতা যুদ্ধ বিধ্বন্ত বাংলাদেশ পুনর্গঠনের পাশাপাশি বিজ্ঞান ও প্রযুুক্তিকে বিশেষ অগ্রাধিকার দেন। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে বাংলাদেশ ১৯৭৩ সালে আন্তর্জাতিক টেলিযোগাযোগ সংস্থা (আইটিইউ)-এর সদস্যপদ লাভ করে। তিনি ১৯৭৩ সালে বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদ (বিসিএসআইআর) প্রতিষ্ঠা করেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ডিজিটাল বাংলাদেশ বাস্তবায়নে আমাদের সরকার বিগত সাড়ে সাত বছরে আইসিটি খাতে আমূল পরিবর্তন এনেছে। আজ দেশের প্রতিটি উপজেলা ফাইবার অপটিক কেবলের আওতায় এসেছে। যে ব্যান্ডউইথ এর দাম ২০০৭ সালে ছিল ৭৬ হাজার টাকা, তা কমিয়ে বর্তমানে মাত্র ৬২৫ টাকায় এনেছি। ইতোমধ্যে প্রায় সব উপজেলায় থ্রিজি সেবার আওতায় এসেছে। আগামী ২০১৭ সালের মধ্যেই ফোর-জি চালুর পরিকল্পনা করা হয়েছে।

তিনি বলেন, দেশে আজ প্রায় ১৩ কোটির বেশি মোবাইল সিম ব্যবহৃত হচ্ছে। ৬ কোটি ৪০ লাখ মানুষ ইন্টারনেট ব্যবহার করছে। ৫ হাজার ২৫০টি ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টারর মাধ্যমে প্রত্যন্ত অঞ্চলের লোকজন ২০০ ধরনের ডিজিটাল সেবা গ্রহণ করছে। ৩ হাজার ডাকঘরেও ডিজিটাল সেবা দেওয়া হচ্ছে। কয়েকটি উন্নত দেশসহ প্রায় ৪০টি দেশে আমরা সফটওয়্যার ও আইসিটি সেবা রপ্তানি করছি।

সরকারি সেবা পেতে এখন আর মানুষকে অযথা হয়রানির শিকার হতে হয় না উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, লাইনে দাঁড়িয়ে ফর্ম জমা দেওয়া লাগে না। এক সময় এদেশে ‘হাওয়া ভবন’ সৃষ্টি করে ঘুষ বাণিজ্যকে যে প্রাতিষ্ঠানিকরূপ দেওয়া হয়েছিল, আমরা তথ্য-প্রযুক্তির ব্যবহারের মাধ্যমে তা বন্ধ করেছি। ে টেন্ডার বাণিজ্য বন্ধ হয়েছে। সরকারি টেন্ডারগুলো এখন ই-জিপিতে চলে গেছে।
যুব সমাজের কর্মসংস্থানে সরকারের উদ্যোগ সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আইসিটি ব্যবহার করে তরুণ জনগোষ্ঠীর আউটসোসিংয়ের দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য আমরা ‘লার্নিং অ্যান্ড আর্নিং’ প্রকল্প বাস্তবায়ন করছি। এ প্রকল্পের আওতায় ৫৫ হাজার তরুণ-তরুণীকে ফ্রিল্যান্সিং প্রশিক্ষণ প্রদান করা হবে। ইতোমধ্যে ২০ হাজার জনকে ফ্রিল্যান্সিং প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়েছে।

শেখ হাসিনা বলেন, নারীর ক্ষমতায়নের পাশাপাশি উপার্জনের পথ সুগম করতে ‘বাড়ি বসে বড়লোক’ কর্মসূচির আওতায় ১৪ হাজার ৭শ’ ৫০জনকে ফ্রিল্যান্সিং প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়েছে, যার মধ্যে ৭০ শতাংশই নারী।

তিনি বলেন, কালিয়াকৈরে বঙ্গবন্ধু হাই-টেক সিটিসহ সারাদেশে আরও ২০টির মত হাই-টেক পার্ক, সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্ক, আইটি ভিলেজ আমরা গড়ে তুলছি। যশোর সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্কে এ বছরেই পুরোদমে কার্যক্রম শুরু হবে বলে আশা করছি।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, কারওরান বাজারে জনতা টাওয়ারে শুরু হয়েছে সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্কের অপারেশন। আমাদের ছেলে-মেয়েরা যাতে হাতে-কলমে কারিগরি শিক্ষা নিতে পারে সে জন্য গড়ে তুলছি আইটি ট্রেনিং অ্যান্ড ইনকিউবেশন সেন্টার।

প্রধানমন্ত্রী তাঁর বক্তৃতার শেষ পর্যায়ে সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তুলতে সকলকে একযোগে কাজ করার আহবান জানিয়ে বলেন, আসুন, দলমত নির্বিশেষে সকলে মিলে সরকারের রূপকল্প ২০২১ ও ২০৪১ বাস্তবায়নের মাধ্যমে জাতির পিতার স্বপ্নের ক্ষুধা-দারিদ্র্যমুক্ত ও উন্নত-সমৃদ্ধ ‘সোনার বাংলা’ গড়ে তুলি।

প্রধানমন্ত্রী আলোচনা পর্ব শেষে মেলার বিভিন্ন স্টল ঘুরে দেখেন এবং উদ্যোক্তাদের সঙ্গে কথা বলেন।
প্রসঙ্গত, এবারের মেলায় ৪০টি মন্ত্রণালয় ডিজিটাল বাংলাদেশ হিসেবে কি কি সেবা দিচ্ছে তার আদ্যোপান্ত তুলে ধরা হচ্ছে। মেলায় শীর্ষস্থানীয় শতাধিক বেসরকারি প্রতিষ্ঠান তাদের ডিজিটাল কার্যক্রম তুলে ধরছে। তিন দিনব্যাপী আয়োজনে মাইক্রোসফট, ফেসবুক, একসেন্সার, বিশ্বব্যাংক, জেডটিই, হুয়াওয়েসহ খ্যাতিমান প্রতিষ্ঠানের ৪৩ জন বিদেশি বক্তাসহ দুই শতাধিক বক্তা ১৮টি সেশনে অংশ নেবেন।

এছাড়া নেপাল, ভুটান, সৌদি আরবসহ ৭টি দেশের ৭ জন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী মিনিস্ট্রিয়াল কনফারেন্সে অংশ নেবেন।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের পর প্রধানমন্ত্রী সরকারের লার্নিং এন্ড আর্নিং প্রকল্পের আওতায় ও আইসিটি ডিভিশিন, রবি ও হুয়াওয়ে’র যৌথ উদ্যোগে গ্রামীণ পর্যায়ে নারীদের প্রশিক্ষণ প্রদানের জন্য পাঁচটি মোবাইল বাসের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। এই বাসগুলোর মাধ্যমে আগামী তিন বছরে আড়াই লক্ষ গ্রামীণ ও সুবিধাবঞ্চিত নারীদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। এরপর প্রধানমন্ত্রী মেলা প্রাঙ্গণের স্টলগুলো ঘুরে দেখেন।

মেলা চলবে প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে শুরু হয়ে রাত ৮টা পর্যন্ত। এতে প্রবেশে কোনো ফি নেই। আগামী ২১ অক্টোবর সন্ধ্যায় এ আয়োজনের সমাপনী অনুষ্ঠান হবে।

 

– সিনিউজভয়েস ডেস্ক

Please Share This Post.