ডাটা সেন্টার

একসময় ডাটা বা তথ্যের অভাবই যেখানে ছিল মহাসমস্যা, এখন সেখানে তথ্যের অতিরিক্ত প্রাপ্তিই হচ্ছে বড় সমস্যা। আর এই সমস্যাই সৃষ্টি করেছে তথ্য বিস্ফোরণের। কী করব আমরা এত তথ্য নিয়ে? কোথায় রাখব এগুলো? কীভাবে ব্যবস্থাপনা ও রক্ষণাবেক্ষণ করব? আমাদের এই প্রশ্নের জবাব দিতে ফের পাশে এসে দাঁড়াচ্ছে সেই প্রযুক্তিই। তথ্য সংগ্রহ, সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াকরণ, বিতরণ সব কিছুুতেই প্রযুক্তির ব্যবহার আমাদের সাহায্য করছে তথ্য বিস্ফোরণকে মোকাবেলা করার। আর তথ্য ব্যবস্থাপনার কাজে প্রযুক্তির ব্যবহারের একটি অনুপম দৃষ্টান্ত হচ্ছে ডাটা সেন্টার। প্রতিনিয়ত বেড়ে চলা ডাটার বিপুল পাহাড়কে নিজ বক্ষে আশ্রয় দিয়ে যেটি তথ্যনির্ভর এই সমাজের চাহিদা পূরণে অসাধারণ ভূমিকা রেখে চলেছে।

কী এই ডাটা সেন্টার?

ডাটা তথা উপাত্তময় এই বিশ্বে ডাটা সেন্টার এখন আমাদের মস্ত বড় এক অবলম্বন। কিন্তু কী এই ডাটা সেন্টার? সহজ করে বলতে গেলে, ডাটা সেন্টার হল কেন্দ্রীয় একটি স্থান যেখানে বিপুল পরিমাণে ডাটা সংগ্রহ, সংরক্ষন, প্রক্রিয়াকরণ ও বিতরণের জন্য প্রয়োজনীয় কম্পিউটিং ও নেটওয়ার্কিং উপকরণসমূহকে রাখা হয় (centralized locations where computing and networking equipment is concentrated for the purpose of collecting, storing, processing, distributing or allowing access to large amounts of data)। কম্পিউটারের আবির্ভাবের পর থেকেই কোনো না কোনো রূপে কিন্তু এই ডাটা সেন্টার-এর অস্তিত্ব ছিল, এখনও আছে, ভবিষ্যতেও থাকবে। অতীত কালে কম্পিউটারের আকার ছিল গোটা একটা কক্ষের সমান। সেসময় হয়ত একটা সুপারকম্পিউটারই ছিল একটি ডাটা সেন্টার। পরবর্তীকালে কম্পিউটার উপকরণের আকার দ্রত কমতে থাকে, দামে হতে থাকে সস্তা। এছাড়া উপাত্ত প্রক্রিয়াকরণের পরিমাণও ক্রমশ বাড়তে থাকে। তখন আমরা একাধিক সার্ভারকে একত্রিত করে নেটওয়ার্কিং করতে শুরু করি। উদ্দেশ্য ছিল, প্রক্রিয়াকরণের গতিকে বৃদ্ধি করা। এসব সার্ভারকে বিভিন্ন কমিউনিকেশন নেটওয়ার্কের সাথে যুক্ত করা হলো যাতে করে আমরা দূর থেকে সেগুলোতে অ্যাকসেস নিতে ও ডাটাকে ব্যবহার করতে পারি। এই দলবদ্ধ সার্ভার (সার্ভার “ক্লাস্টার”) এবং সংযুক্ত ইকুইপমেন্টগুলো একটি কক্ষ, গোটা একটি দালান বা কয়েকটি দালানে স্থান করে দেয়া হল। আর এভাবেই জন্ম নিল আধুনিক ডাটা সেন্টার। বর্তমান সময়ের বড় বড় ডাটা সেন্টারে এরকম হাজার হাজার ক্ষুদ্র কিন্তু শক্তিশালী সার্ভার আছে যেগুলো দিনরাত চব্বিশ ঘণ্টা চলতে থাকে। সার্ভারের এই ব্যাপক কেন্দ্রীকরণের সুবাদে (যেখানে সার্ভারগুলো সারি সারি তাকে রাখা হতে পারে), এগুলোকে প্রায়ই সার্ভার ফার্ম বলা হয়ে থাকে। এগুলো ডাট সংরক্ষণ, ব্যাকআপ ও রিকভারি, ডাটা ব্যবস্থাপনা ও নেটওয়ার্কিংয়ের মত গুরুত্বপূর্ণ সব কাজ করে। এ সেন্টারগুলো ওয়েব সাইট স্টোর ও সার্ভ করা, ইমেইল ও ইনস্ট্যান্ট মেসেজিং সার্ভিস দেয়া, ক্লাউড স্টোরেজ ও অ্যাপ্লিকেশন সেবা প্রদান, ই কমার্স লেনদেন ও অনলাইন গেমিং কমিউনিটিগুলোকে সেবাদানের মত নানা ধরনের কাজ করে থাকে। বস্তু এমন সব কাজেই এদের ব্যবহার বেশি হয় যেখানে বিপুল পরিমাণে শূন্য আর এক তথা বাইনারি ডাটাকে প্রক্রিয়াকরণ তথা ‘ক্রাঞ্চিং’ করার দরকার হয়।
বর্তমানে বলতে গেলে বড় বড় প্রায় সমস্ত সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর হয় নিজস্ব ডাটা সেন্টার অথবা অন্য কারও ডাটা সেন্টারের শরণ নেয়ার প্রয়োজন হয়ে থাকে। কেউ কেউ এগুলোকে ইন-হাউস তৈরি করেন, আবার কেউবা কো-লোকেশন ফ্যাসিলিটিজ (পড়ষড়ং নামে পরিচিত) ব্যবহার করেন, আবার কেউ কেউ গুগল, মাইক্রোসফট, সনি বা আমাজনের মত প্রতিষ্ঠান কর্তৃক পরিচালিত পাবলিক ক্লাউডভিত্তিক সেবা গ্রহণ করে থাকেন। কো-লোকেশন ফ্যাসিলিটিজসহ বড় বড় ডাটা সেন্টারগুলো বস্তুত ১৯৯০-এর দশকের শেষের দিকে প্রতিষ্ঠিত হতে শুরু করে যখন থেকে ইন্টারনেটের বৈশ্বিক ব্যবহার ব্যাপক হারে বাড়তে থাকে। কিছু কিছুু বড় বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানের ডাটা সেন্টার ছড়িয়ে আছে সারা বিশ্বের সর্বত্র, যেগুলো অহোরাত্রি ব্যস্ত আছে বিপুল পরিমাণে ডাটা প্রক্রিয়াকরণ ও সেবাদানের কাজে। এক হিসাব থেকে জানা যায় সারা বিশ্বে বর্তমানে ৩০ লক্ষের মত বিভিন্ন আকারের ডাটা সেন্টার রয়েছে।

ডাটা সেন্টার কেন প্রয়োজন?

কম্পিউটার হার্ডওয়্যার ক্রমশই আকারে ছোট, দ্রতগতির ও আরো শক্তিশালী হচ্ছে বটে, কিন্তু তারপরও যেন আরো দ্রত, আরো শক্তিশালী কম্পিউটারের জন্য আমাদের তৃষ্ণা কমছে না। ফলে দিনদিন বাড়ছে প্রসেসিং পাওয়ার, স্টোরেজ স্পেস এবং নতুন নতুন তথ্যের জন্য আমাদের চাহিদা। আগেই বলেছি, ডাটা ব্যবহার করে এমন যে কোনো প্রতিষ্ঠানেরই দরকার ডাটা সেন্টারের সাহায্য নেয়া। বিশেষত সরকারি সংস্থা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, টেলিযোগাযোগ প্রতিষ্ঠান, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, খুচরা পণ্য বিক্রেতা এবং অনলাইন ইনফরমেশন (গুগল) ও সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং সার্ভিসগুলোরই (ফেসবুক) বেশি ডাটা নিয়ে কাজ করার দরকার হয়। ডাটায় দ্রতগতির ও নির্ভরযোগ্য অ্যাকসেস না থাকার মানেই হল সেবাগ্রহীতাদের প্রয়োজনীয় সেবা দিতে না পারা, যাতে ব্যবসার সমূহ ক্ষতি এড়ানো যাবে না। ইন্টারন্যাশনাল ডাটা কর্পোরেশনের একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে, ২০১১ সালে প্রায় ১.৮ ট্রিলিয়ন গিগাবাইট বা প্রায় ১.৮ জেটাবাইট পরিমাণ ডিজিটাল তথ্য তৈরি হয়েছিল। আর ২০১২ সালে প্রায় ২.৮ জেটাবাইট এবং ২০২০ সালে এটি হতে পারে ৪০ জেটাবাইট। এই যে বিপুল পরিমাণে ডাটা, এগুলো কিন্তু কোথাও না কোথাও অবশ্যই সংরক্ষণ করতে হবে। বর্তমানে দিন দিন আরো বেশি করে ডাটা ক্লাউডে চলে যাচ্ছে। এর মানে হচ্ছে, আমাদের বাড়ি বা অফিসের কম্পিউটারে ডাটাকে রাখার পরিবর্তে আমরা এগুলোকে ক্লাউড সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর সার্ভারে রেখে দিচ্ছি। অনেক কোম্পানিও তাদের প্রফেশনাল অ্যাপ্লিকেশনগুলোকে এখন ক্লাউডে রেখে দিচ্ছে। এর মানে হল, নিজেদের বাসাবাড়ির কম্পিউটারের বদলে আমরা এখন ডাটা ও অ্যাপ্লিকেশনগুলোকে চালাচ্ছি নেটওয়ার্কের মাধ্যমে, সার্ভার থেকে। ক্লাউড মানে কিন্তু এই না যে আপনার অ্যাপ্লিকেশন ও ডাটাগুলো কোনো কম্পিউটার হার্ডওয়্যারে নেই। অবশ্যই আছে। তবে সেই কম্পিউটার আছে দূরবর্তী কোনো লোকেশনে, যেগুলোতে অ্যাকসেস করা যাবে ইন্টারনেট ব্যবহার করে। এই যে দূরবর্তী লোকেশনের কথা বললাম, এগুলোই হল ডাটা সেন্টার।

Please Share This Post.