গ্রামীণফোনের কর্মীদের চাকুরী বাঁচাতে সরকারের হস্তক্ষেপ কামনা

টেকনোলজী বিভাগের ৬০০ কর্মী সহ অন্যান্য বিভাগের মোট প্রায় ১০০০ কর্মীর চাকুরী হারানোর আশংকা প্রকাশ করে কতকাল এক সংবাদ সম্মেলন করেছে গ্রামীণফোন এমপ্লয়ীজ ইউনিয়ন। এতে সংগঠনের সভাপতি ফজলুল হকের সভাপতিত্বে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন সাধারন সম্পাদক মিয়া মোহাম্মদ শাফিকুর রহমান মাসুদ। মাসুদ বলেন, গ্রামীনফোন “সিডিসি” নামের একটি প্রজেক্ট বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে, যার ফলে গ্রামীণফোনের টেকনোলজি বিভাগের প্রায় ছয় শতাধিক কর্মী চাকুরী হারাতে পারে। তিনি অভিযোগ করেন, টেকনোলজি বিভাগের সাধারন কর্মীরা ঐক্যবদ্ধভাবে উক্ত প্রজেক্টের প্রতিবাদ করে যা”েছ। কর্মীরা প্রতিবাদ করলে, কোম্পানীর পক্ষ থেকে ইমেইল দিয়ে হুমকি প্রদান সহ শ্রম অধিদপ্তরে সাধারন কর্মীদের নামে অভিযোগ দায়ের করেছে। তারা দাবী করেন, ২০০৭ সাল থেকে ধাপে ধাপে বিভিন্ন সময়ে প্রায় ৩০০০ (তিন হাজার) স্থায়ী কর্মীসহ এ পর্যন্ত প্রায় ৫০০০ (পাঁচ হাজার) কর্মী গ্রামীণফোন থেকে বিদায় নিয়েছে।

২০০৭ সালে গ্রাহকসেবা কেন্দ্র জিপিএসডি’র প্রায় ৫০০ কর্মীকে ছাঁটাই করার মাধ্যমে গ্রামীণফোনে চাকুরীচ্যুত করার অভিযান শুরু হয়। এরপর ২০১০ সালে মানবসম্পদ বিভাগে পুনর্গঠনের নামে প্রায় অর্ধ শতাধিক কর্মীকে চাকুরীচ্যুত করা হয় এবং গ্রামীণফোন এমপ্লয়ীজ ইউনিয়ন রেজিষ্ট্রেশন আবেদন অনিস্পন্ন থাকাবস্থায় ২০১২ সালের জুলাই মাসে মধ্য রাতে একটি ইমেইল দিয়ে আরো প্রায় দেড় শতাধিক কর্মীকে চাকুরীচ্যুত করা হয়। এই চাকুরীচ্যুতির আদেশকে চ্যালেঞ্জ করে ২২ জন কর্মী শ্রম আদালতে মামলা দায়ের করেন, যারা এখনো ন্যায় বিচারের অপেক্ষায় আছেন। এছাড়া গত দুই বছরে ধাপে ধাপে কাস্টমার সার্ভিসের প্রায় দুই শতাধিক কর্মীকে বিদায় করা হয়।

২০১২ সালের গ্রামীণফোন এমপ্লয়ীজ ইউনিয়ন (জিপিইইউ) গঠিত হয় এবং রেজিষ্ট্রার অব ট্রেড ইউনিয়নের নিকট রেজিষ্ট্রেশনের আবেদন করা হয়। সকল নিয়ম কানুন পরিপালন করে আবেদন করা হলেও, রেজিষ্ট্রেশনের আবেদনটি প্রত্যাখ্যান করা হয়। উল্লেখ্য, আইন অনুসারে কোন দলিল, তথ্য বা উপাত্তের প্রয়োজন হলে আবেদন প্রাপ্তির পর সংশ্লিষ্ট ইউনিয়নকে নোটিশ দিতে হয়। কিন্তু কোন ধরনের সুযোগ না দিয়ে একতরফাভাবে উক্ত আবেদনটি প্রত্যাখ্যান করা হয়।

ডিজিটালাইজড করার ম্যাধ্যমে গ্রাহক অভিযোগের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কমলেও গ্রামীণফোনের কাস্টমার সার্ভিস ডিপার্টমেন্টকে আউটসোর্স করার ফলে গ্রাহক সেবার মান অনেকটাই কমেছে। প্রায়শই অভিযোগ পাওয়া যায় যে, কলসেন্টারে কল করে এখন আর মানসম্মত সেবা পাওয়া যায় না। অনেক সময় অপেক্ষা করে এজেন্টকে পাওয়া গেলেও সমস্যার সমাধান পাওয়া যায় না। আমরা মনে করি, প্রকৃত গ্রাহকসেবা দিতে হলে গ্রামীণফোনকে নিজস্ব কলসেন্টার চালু করতে হবে।

কাস্টমার সার্ভিস ডিপার্টমেন্টকে আউটসোর্স করার পর ২০১৮ সালে গ্রামীণফোনের টেকনোলজি ও কমার্শিয়াল ডিডিভশনের বাদে অন্যান্য ডিভিশনের কর্মী সংখ্যা কমানোর জন্য টেলিনর থেকে প্রজেক্ট ব্রীজ নামে একটি প্রকল্প হাতে নেয়া হয়, যা ২০১৯ সাল পর্যন্ত চলবে। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আরো অনেককেই স্বে”ছা অবসর গ্রহণের প্যাকেজ প্রদান করা হয়েছে এবং হবে। এর পাশাপাশি ২০২০ নামে আরেকটি প্রজেক্ট শুরু হয়েছে, যার মাধ্যমে অন্যান্য বিভাগের আরো কত কর্মী চাকুরী হারাবে তা অনিশ্চিত।

প্রজেক্ট ব্রীজ চলাকালীন সময়ে টেকনোলজি বিভাগে সিডিডি নামক প্রজেক্টে ঘোষনা করা হয়েছে। টেলিনরের মালয়েশিয়া ও পাকিস্তানে সিডিসি বাস্তবায়ন করা হয়েছে। এই প্রজেক্টের উদ্দেশ্য সম্পর্কে বলা হয়েছে, নেটওয়ার্কের উন্নয়নের জন্য এটি প্রয়োজন রয়েছে, যার সক্ষমতা গ্রামীণফোনের নেই। কিন্তু মালয়েশিয়া ও পাকিস্তানের অভিজ্ঞতা থেকে ইউনিয়ন নেতৃবৃন্দ আশংকা প্রকাশ করেন যে, এই প্রজেক্ট বাস্তবায়ন হলে গ্রামীণফোনের টেকনোলজি বিভাগের হাতেগোনা কয়েকজন বাদে প্রায় সকল কর্মী চাকুরী হারাবেন।

উল্লেখ্য, নেটওয়ার্কেরর মান নির্ভর করে স্পেক্টট্রাম, টাওয়ার তথা যন্ত্রপাতি সচল থাকা এবং প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতিসহ প্রয়োজনী সংখ্যক টাওয়ার থাকা। গ্রামীণফোনের প্রয়োজনীয় স্পেক্টট্রাম রয়েছে। প্রয়োজনে সরকারের সহযোগীতা নিয়ে আরো স্পেক্টট্রাম কিনতে পারে। গ্রামীণফোনের টাওয়ার তথা যন্ত্রপাতি সচল থাকা মূলতঃ নির্ভর করে বিদ্যুৎ সরবরাহ থাকা এবং তার অবর্তমানে ব্যাটারী ও জেনারেটর ব্যক-আপ থাকার উপর। গ্রামীণফোনের টাওয়ার তথা যন্ত্রপাতি সচল থাকার হার দেশের মধ্যে সর্বোচ্চ। এছাড়া, টাওয়ারগুলোতে নিরাপত্তা প্রহরী নিয়োগ এবং জেনারেটর রাখার মাধ্যমে এই সচল রাখার হার আরো রাড়ানো সম্ভব এবং সেজন্য গ্রামীণফোনকে আরো বিনিয়োগের দিকে মনোযোগ দিতে হবে। আর গ্রাহকদের জন্য আরো মানসম্মত নেটওয়ার্ক সেবা দিতে হলে টাওয়ার এবং যন্ত্রপাতির জন্য জন্য আরো বিনিয়োগ করতে হবে। কিন্তু সিডিসির প্রয়োজন নেই।

এর আগে জিপি’র আইটি ডিপার্টমেন্টের কাজ এ্যক্সেঞ্চার নামের একটি প্রতিষ্ঠানকে দেয়া হয়, যেটি বিশ্বের অন্যতম নামীদমি আইটি কোম্পানী। কিন্তু তারা এদেশে ব্যর্থ হয়ে চলে গেছে। গ্রামীণফোনের আইটি ডিপার্টমেন্টের কর্মীদের প্রথমে জিপিআইটি কোমপানীতে পাঠানো হয়, যার অধিকাংশ শেয়ার এ্যক্সেঞ্চার কিনে নেয়। পরবর্তীতে এ্যক্সেঞ্চার এদেশ থেকে ব্যবসা গুটিয়ে নিলে অধিকাংশ কর্মীই চাকুরী হারান।

বর্তমানে অনেকেই অভিযোগ করছেন, গ্রামীণফোনের নেটওয়ার্কের মান দিনে দিনে খারাপ হচ্ছে। এ বিষয়ে তারা সম্ভাব্য দুটি কারন বলেন; এক. গ্রাহক সংখ্যা যে হারে বাড়ছে, সেই হারে টাওয়ার তথা প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি বাড়ানো হচ্ছেনা, অর্থাৎ আয় বা মুনাফার সাথে সামঞ্জস্য রেখে বিনিয়োগ করা হচ্ছে না এবং দুই. নেটওয়ার্ক মেইনটেনেন্স এর কাজ আউটসোর্স করা। নেটওয়ার্ক মেইনটেনেন্স এর কাজও নামীদামি প্রতিষ্ঠানকে দেয়া হয়েছে, কিš‘ তারা প্রতিনিয়ত ব্যর্থ হচ্ছে। এসব ঘটনা প্রমান করে, আউটসোর্স করে নেটওয়ার্কের মান ভাল হবে না। বরং দীর্ঘদিন ২০ টি বছর যে কর্মীরা নেটওয়ার্ক মান বৃদ্ধি করেছে, তাদের চাকুরীর নিশ্চয়তা বিধান করে, আউটসোর্সি বন্ধ করে, নিজস্ব কর্মীদের দিয়ে কাজ করানোর মাধ্যমে নেটওয়ার্কের মান বাড়াতে হবে। প্রয়োজনে নিজস্ব কর্মী সংখ্যা আরো বাড়াতে হবে।

এক্ষেত্রে বিটিআরসি এবং গ্রাহকরা ভূমিকা পালন করতে পারে তারা আশা প্রকাশ করেন। তারা বলেন, কোয়ালিটি অব সার্ভিস যাতে নিশ্চিত হয়, সেজন্য বিটিআরসি’র নজরদারি বাড়াতে হবে। অপরদিকে, গ্রাহকরা তাদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হলে, কোম্পানী তার সেবার মান বাড়াতে বাধ্য হবে। এর ফলে, কর্মীদের চাকুরীর নিশ্চয়তা বৃদ্ধি পাবে। জিপিইইউ এর পক্ষ থেকে শ্রম মন্ত্রনালয়কে উদ্দেশ্য করে আরো বলা হয়, ট্রেড ইউনিয়নের কোন আবেদন পেলে তা কিভাবে সহজে রেজিষ্ট্রেশন দেয়া যায়, সেব্যাপারে শ্রমিকদের সহায়তা করতে পারে। মালিকপক্ষ কোন অনুমোদনের জন্য আবেদন করলে, তা যথাযথ পরীক্ষা নীরিক্ষা করে, শ্রমিকদের সাথে আলোচনা করে, যদি সেই আবেদন ন্যায়সঙ্গত হয়, তবেই অনুমোদন দেয়ার অনুরোধ জানানো হয়।

জিপিইইউ নেতৃবৃন্দ আশা প্রকাশ করেন, সরকার আরো অধিক শ্রমিক বান্ধব আইন পাশ করেন, যাতে শ্রমিকরা সহজেই বঞ্চনা থেকে মুক্তি পায়। একই সাথে প্রস্তাবিত সংশোধনীতে যদি শ্রমিকদের প্রতিকূলে কোন বিধান প্রস্তাব করা হয়ে থাকে, তবে তা সংশোধন করার দাবী জানানো হবে।

সভায় বাংলালিংকে গতকাল যেভাবে ৩৭ জন কর্মীকে চাকুরীচ্যুত করা হয়েছে, তাতে তারা উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, কোম্পানীটি বছরে হাজার হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আয় করলেও তাদের কেন মুনাফা হয়না, নাকি অন্য কোন মেকানিজম আছে তা তদন্তের দাবী করেন এবং একই সাথে বাংলালিংকের কর্মীদের চাকুরী নিশ্চয়তা বিধান করা, যথাযথ কর্ম পরিবেশ নিশ্চিত করার দাবী জানান।

সংবাদ সম্মেলনে যোগদানকারী বাংলালিংক এমপ্লয়ীজ ইউনিয়নের সভাপতি সোহাগ বলেন, সম্পূর্ন বেআইনীভাবে রাতের আধারে যেভাবে কর্মীদের চাকুরীচ্যুত করা হযেছে তা নজিরবিহীন। তিনি অনতিবিলম্বে কর্মীদের চাকুরী ফিরিয়ে দেবার আহবান জানান।

সংবাদ সম্মেলেনে ইউএনআই বাংলাদেশের সেক্রেটারী মোস্তাফা কামাল সহ অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন রফিকুল কবির সৈকত, ইমরুল কায়েস, জিয়াউর রহমান, মাযহারুল হক, এএনএম মাইনুল হোসেন, মির্জা আতিকুজ্জামান

বক্তব্য শেষে ১২ দফা দাবী পেশ করা হয়ঃ
১। গ্রামীণফোনে সিডিসি এবং প্রজেক্ট ব্রীজসহ চাকুরী হারানোর আশংকা আছে এমন সকল প্রজেক্ট অনতিবিলম্বে বন্ধের ঘোষনা দিতে হবে।
২। সকল কর্মীর ন্যূনতম বেতন হবে শ্রম বাজারের গড় বেতনের সমান অর্থাৎ কম্পারেশিও হবে ন্যূনতম ১০০%।
৩। পজিটিভ আউটলেয়ার প্রথা তুলে দিতে হবে। নির্ধারিত সময়ে পদোন্নতি দিতে হবে। যাদের গত ৪ বছরে কোন পদোন্নতি দেয়া হয়নি তাদের দ্রুততম সময়ে পদোন্নতি দিতে হবে।
৪। ওভারটাইম এ্যালাউন্স না দিয়ে, পদ মর্যাদা নির্বিশেষে কাউকে ৮ ঘন্টার বেশী কাজ করানো যাবে না।
৫। কাজের টার্গেট এমনভাবে সেট করতে হবে, যাতে ৮ ঘন্টার মধ্যে সম্পন্ন করা যায়।
৬। কর্মীদের জন্য পেনশনের ব্যবস্থা করতে হবে।
৭। ট্রেড ইউনিয়নের সদস্যদের সাথে বৈষম্যমূলক আচরন বন্ধ করতে হবে।
৮। ট্রেড ইউনিয়নের সদস্যদের মামলার কার্যক্রমের উপর চলমান স্থগিতাদেশ প্রত্যাহারের জন্য অবিলম্বে ব্যবস্থা গ্রহণ করে তাদের ন্যায়বিচারের পথ সুগম করতে হবে।
৯। স্থায়ী ধরনের কাজে সকল ধরনের অস্থায়ী কর্মী নিয়োগ বন্ধ করতে হবে এবং বর্তমানে যত ধরনের অস্থায়ী কর্মী আছে, তাদের চাকুরী স্থায়ী করতে হবে। কোন ধরনের স্থায়ী কাজ আউটসোর্স করা যাবে না।
১০। প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরে সংবিধান মোতাবেক মৌলিক অধিকার তথা বাক স্বাধীনতা, সংগঠনের স্বাধীনতা এবং সমাবেশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে এবং উহার পরিপন্থী কাজের সাথে জড়িতদের বিরূদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
১১। সরকারের প্রতি দাবী জানানো হয় যে, বিদেশীরা বাংলাদেশে বিনিয়োগ করলে বিনিয়োগ অনুমোদনকালে তারা এদেশের সরাসরি এবং স্থায়ী কি পরিমান কর্ম সংস্থান সৃষ্টি করবে সেদিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে এবং একই সাথে কর্মীদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি কি ধরনের কল্যান সুবিধা নিশ্চিত করবেন সেদিকে খেয়াল রেখে অনুমোদন দেয়ার দাবী জানানো হয়।
১২। টেলিকম খাতের প্রতিষ্ঠানগুলো এদেশে প্রচুর রাজস্ব আয় করে। রাজস্ব আয়ের ন্যূনতম বিশ শতাংশ কর্মীদের বেতন ও কল্যানের জন্য ব্যয় করতে বাধ্য করার জন্য আইন প্রনয়নের এবং টেলিকম খাতে বিদেশী কর্মী সংখ্যা নিয়ন্ত্রনের দাবী জানানো হয়।

প্রেস বিজ্ঞপ্তি

 

 

Please Share This Post.