কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও মানব সভ্যতার দ্বন্দ্ব যেখানে

ড্যান ব্রাউনের ‘অরিজিন’ উপন্যাসটি যারা পড়েছেন তারা হয়ত কিছুটা আঁচ পেয়ে থাকবেন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দৌরাত্ম্য সম্পর্কে।  ‘অরিজিন’ উপন্যাসের কাহিনী কাল্পনিক হলেও  কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বাস্তব অগ্রগতি এখন কল্পনাকেও হার মানায়। মানব সভ্যতায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কতখানি দানবীয় গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে তা বোঝা যায় গত বছরের ব্রিটিশ পার্লামেন্টের একটি ঘটনায়। গত বছর  ব্রিটিশ পার্লামেন্টের ‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং চতুর্থ শিল্প বিপ্লব’ বিষয়ক একটি শুনানিতে পার্লামেন্টারিয়ানদের সাথে আলোচনায় অংশগ্রহন করতে আমন্ত্রন জানানো হয়  ‘পিপার’ নামের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সম্পন্ন একটি রোবটকে। এসময় রোবট পিপার সংশ্লিষ্ট বিষয় ছাড়াও নৈতিকতা ও সামাজিক ন্যায়বিচারের মত ‘মানবীয়’ বিষয়েও আলোচনায় অংশ নেয়। পার্লামেন্টারিয়ানদের এক প্রশ্নের জবাবে পিপার অবশ্য তাদের আশ্বস্ত করেছেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কখনই মানবজাতির প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে দাঁড়াবে না। পিপারের এই উত্তরের উপর কতখানি আস্থা রাখা যাবে সেটি অবশ্য ভাববার বিষয়।

একসময় কম্পিউটারকে সংজ্ঞায়িত করা হত বুদ্ধিহীন একটি যন্ত্র হিসাবে, যা কিনা কেবলমাত্র মানুষের দেয়া নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ করতে পারে। তবে কম্পিউটারের সেই সংজ্ঞা প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হচ্ছে। কম্পিউটার এখন মেশিন লার্নিং ও ডীপ লার্নিং প্রযুক্তির মাধ্যমে মানুষের মতই বুদ্ধিমান হয়ে উঠছে। অতীতে কম্পিউটার অনেক যান্ত্রিক কাজে মানুষকে পেছনে ফেললেও ‘কগনিটিভিটি ও ক্রিয়েটিভিটির’ মত মানবীয় বিষয়গুলো ছিল কম্পিউটারের ধরা ছোঁয়ার বাইরে। সেই ধারনাও এখন বদলে যাচ্ছে, লেখালেখি বা চিত্রকর্মের মত অতিসংবেদনশীল সৃষ্টিশীল বিষয়ও এখন কম্পিউটার দখল করে নিচ্ছে। অথচ মানুষ হলেই যে সবাই শিল্প-সাহিত্যের মত বিষয়ে সৃষ্টিশীলতা দেখাতে পারে এমনটি নয়।  কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এখন সঙ্গীত সৃষ্টি করছে, ছবি আঁকছে, উপন্যাসও লিখছে। জাপানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা রচিত একটি উপন্যাস মৌলিক সাহিত্য হিসাবে পুরুস্কারের জন্য প্রাথমিক ভাবে নির্বাচিত হয়েছিল। ধারনা করা হচ্ছে সামনের দিনের বেস্টসেলার বইয়ের পুরুস্কারগুলো দখল করে নিবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ভিত্তিক অ্যালগোরিদম। সম্প্রতি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্বারা আঁকা একটি চিত্রকর্ম ৪৩২০০০ ডলারে বিক্রিও হয়েছে, চিত্রকর্মটির নিচে মানব শিল্পির মত  কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ভিত্তিক অ্যালগোরিদম তার একটি স্বাক্ষরও করে দিয়েছে।

সাংবাদিকতার মত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়েও রয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার পদচারনা ইতোমধ্যে নিউ ইয়র্ক টাইমস, এপি, রয়টার্সের মত আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সফটওয়্যারকে অটোমেটেড জার্নালিস্ট বা সাংবাদিক হিসাবে নিয়োগ দিয়েছে। জাপানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ভিত্তিক সংবাদ সংস্থা চালু হয়েছিল ২০০৮ সালেই, নতুন ধারার এই সাংবাদিকেরা মানুষের চেয়ে কোন দিকেই কম দক্ষ নয় বরং দ্রুততা এবং নির্ভুলতা মানুষের চেয়েও বেশী। চীনে ইতোমধ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ভিত্তিক ভার্চুয়াল সংবাদ পাঠককে দিয়ে সংবাদ পরিবেশন করা হচ্ছে। এসব ঘটনা থেকে সহজেই  বোঝা যায় আগামীর গণমাধ্যম শিল্পের গতিপথ কোন দিকে প্রবাহিত হচ্ছে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এই ভয়াল থাবার প্রভাব ইতোমধ্যেই কর্মবাজারে পড়া শুরু হয়ে গেছে। টেক জায়ান্ট কোম্পানি অ্যাপলের হার্ডওয়্যার নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ফক্সকন ইতোমধ্যে  ৬০ হাজার কর্মী ছাটাই করে তার পরিবর্তে রোবটকে কর্মী হিসাবে নিয়োগ দিয়েছে। চীনের শিল্প কারখানাগুলোতে রোবটের ব্যবহার বাড়ছে আশংকাজনক ভাবে। গত বছর চীনের কারখানাগুলোতে   রোবট ব্যবহারের হার বৃদ্ধি পেয়েছে ৩০.৮%। ‘ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম’ তাদের একটি গবেষণা প্রতিবেদনে জানিয়েছে ২০২২ সালের ভেতরে রোবটের কারণে বিশ্বজুড়ে সাড়ে ৭ কোটি মানুষ চাকরি হারাবে, মানুষের জায়গা দখল করে নিবে রোবট। আরেক গবেষক ম্যাককিনস জানিয়েছেন ২০৩০ সালের ভেতর বিশ্বের ৮০ কোটি চাকরি দখল করে নিবে রোবট। বুদ্ধিমত্তার প্রযুক্তি যে কেবলমাত্র চাকরি দখল করছে তা নয়, ফরচুন ম্যাগাজিনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে বিশ্বের অন্তত ৫০০ টি নেতৃত্বস্থানীয় কোম্পানি তাদের নিয়োগ পক্রিয়া ছেড়ে দিয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার হাতে, অর্থাৎ যন্ত্র এখন মানুষকে নিয়োগ দিচ্ছে ! তবে অনেক বিশেষজ্ঞ জানিয়েছেন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যে শুধু মানব জাতির চাকরি হারানোর কারন হবে তা নয়, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কারনে নতুন পেশারও সৃষ্টি হবে। ডাটা সাইন্টিস্ট, মেশিন লার্নিং ইঞ্জিনিয়ার, আইওটি এক্সপার্টের মত বিভিন্ন পেশা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উত্থানের ফলে সৃষ্টি হলেও উচু স্তরের এই পেশায় ৩য় বিশ্বের মানুষদের নাগাল পাওয়া কোনক্রমেই সহজ হবে না। উঁচুমানের কারিগরি দক্ষতা সম্পন্ন এসব পেশায় একছত্র আধিপত্য করবে উন্নত বিশ্বের উঁচুতলার মানুষজন, আর বেকার হবে গরীবেরা।

নোবেলজয়ী প্রয়াত বিজ্ঞানী স্টিফেন হকিং, জাতিসংঘের প্রয়াত মহাসচিব কফি আনান অনেক আগেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উত্থান সম্পর্কে আমাদের হুশিয়ার করেছিলেন।  বর্তমান সময়ের আলোচিত প্রযুক্তিবিদ ইলন মাস্ক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উন্নয়নকে ‘Summoning the Demon’ অর্থাৎ ‘দৈত্যকে ডেকে আনার শামিল’ হিসাবে আখ্যায়িত করেছেন। তার মতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানবজাতির জন্য সবথেকে ভয়ংকর হুমকি এমনকি এটি পারমাণবিক বোমার থেকেও বেশী বিপদজনক । কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সবথেকে বড় বিপদ হল এই প্রযুক্তি একসময় মানুষের নিয়ন্ত্রনের বাইরে চলে যেতে পারে, নিজেই একটি সত্ত্বা হিসাবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে। ফেসবুক কর্তৃপক্ষ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সম্পন্ন একটি চ্যাটবটের প্রকল্প ঠিক একই কারনে বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছিল। ফেসবুকের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সম্পন্ন চ্যাটবট ‘মূল প্রোগ্রামের’ বাইরে নিজ থেকে আলাদা একটি ভাষায় মেসেজ আদান প্রদান শুরু করে দিয়েছিল, যার উপর ঐ প্রকল্পের বিজ্ঞানীদের কোন নিয়ন্ত্রন ছিল না। এই ঘটনার পর  ফেসবুক কর্তৃপক্ষ প্রকল্পটি বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়।

চীনের সুপ্রাচীন ‘গো’ খেলায় পেশাদার কিংবদন্তী  খেলোয়াড় লি সিডলকে টানা ৪ বার হারিয়েছে গুগোল ডীপ মাইন্ডের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ‘আলফা গো’। এই ঘটনা আলামত দেয় আগামী দিনে বুদ্ধিভিত্তিক বিষয়গুলোতেও মানুষকে ছাড়িয়ে যেতে পারে কম্পিউটার। মানুষ প্রযুক্তি সৃষ্টি করে তার পরিশ্রম লাঘবের জন্য। মানুষের সাথে যন্ত্রের পার্থক্যই এখানে, কিন্তু যন্ত্র ক্রমশ মানবীয় গুনাবলি অর্জন করতে শুরু করে তবে মানুষ এবং যন্ত্রের বিরোধটা এখানেই শুরু হয়।

অনেকে ধারনা করে আগামী দিনে মানুষের কাজের পরিধি কমে গিয়ে মানুষ হয়ে পরবে ক্রমশ কর্মশূন্য। বুদ্ধিমান যন্ত্রের মাধ্যমে যে বিপুল সম্পদ উপার্জিত হবে তার উপর কর ধার্য করে এবং সেই অর্থ মানবজাতির ভেতর বণ্টন করে মানব সভ্যতায় সমন্বয় করা হবে। নিষ্কর্মা যে জীবনের সম্ভাবনা আমাদের দিকে উকি দিচ্ছে তা একেবারে অমূলক নয়। সেই নিষ্কর্মা জীবন কতখানি সুখকর হবে অথবা  কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তি আমারা কতখানি মানব কল্যাণে কাজে লাগাতে পারবো সেটাই আসল চিন্তার বিষয়। তবে অতীত অভিজ্ঞতায় বলে বেশিরভাগ সময়ে উদ্ভাবিত নানা প্রযুক্তি মানবজাতির কল্যাণের তুলনায়  ‘শোষণ ও ধ্বংসের ’ কাজে প্রয়োগ হয়েছে বেশী। ড্যান ব্রাউন তার উপন্যাসে দেখিয়েছেন মানব সভ্যতাকে ক্রমশ আচ্ছন্ন করে ফেলছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। উপন্যাসের ঘটনা কাল্পনিক হলেও আসল বাস্তবতা হচ্ছে আমরা অনেকটা অজান্তেই প্রবেশ করছি সভ্যতার আরেকটি স্তরে, যেখানে মানব সভ্যতার সাথে সবথেকে বড় দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাথে, যার স্রষ্টা মানুষ নিজেই।

ফজলে রাব্বী খান, প্রকৌশলী ও কলামিস্ট

-সিনিউজভয়েস/২৩এপি/১৯

 

 

Please Share This Post.