করোনা আতঙ্ক: ভার্চুয়াল অফিস ব্যবস্থাপনার দিকে বাংলাদেশ

বিশ্ব যখন একের পর এক উন্নত প্রযুক্তি আবিষ্কারের মধ্য দিয়ে প্রযুক্তির মহাসড়কে, ঠিক তখনই আকস্মিকভাবে চীনের উহানর শহরে গেল বছরের একেবারে শেষ দিনে (৩১ ডিসেম্বর) প্রাদুর্ভাব ঘটে মহাৃমারী নোভেল করোনা কোভিড ১৯। এই ভাইরাসের আঘাতে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়তে শুরুকরে প্রযুক্তি ও বাণিজ্যের পরাশক্তি চীনের সাথে বিশ্বের সকল যোগাযোগ। এরই মাঝে প্রাণঘাতী এই ভাইরাস ছড়িয়ে পড়তে শুরু ইউরোপ-আমেরিকাসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে। চলতে থাকে শত শত মানুষের মৃত্যুর মিছিল। ভয়ঙ্কর এক মহামন্দার দিকে এগিয়ে যেতে থাকে বৈশ্বিক অর্থনীতি।

ক্রমান্বয়ে ভয়ঙ্কর এই ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ে বাংলাদেশও। পরবর্তীতে সরকার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো ১৮ মার্চ থেকে বন্ধ ঘোষণার পরই বাংলাদেশে শুরু হয়েছে মহামারী করোনা আতঙ্ক। ইতোমধ্যে এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে ব্যবসা-বাণিজ্যসহ সমস্ত ক্ষেত্রে।

এ পরিপ্রেক্ষিতে শুরুতে দেশের টেলিকম অপারেটরা গত ১৫ মার্চ তাদের কর্মকর্তা-কর্মচারিদের ভার্চুয়াল অফিস বা ‘ওয়ার্ক ফরম হোম’ পদ্ধতি অনুসরণের ঘোষণা দিয়েছিলো। আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়লে দেশের পরিস্থিতি দেখে সর্বস্তরের জনগণের নিরাপত্তার পাশাপাশি ব্যবসা বাণিজ্য টিকিয়ে রাখতে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়ে এগিয়ে আসে বড় বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্ণধারেরা। তাঁরা একের পর এক ঘোষণা দিতে থাকেন ‘Work from home’ উদ্যোগের। ১৬ মার্চ থেকেই বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এ উদ্যোগে যোগ দিতে থাকে। বর্তমানে প্রযুক্তিভিত্তিক শতশত দেশী বিদেশি প্রতিষ্ঠান তাদের কর্মীদের বাসা/রিমোট অফিস অনুসরণ করতে বলেছেন।

এ প্রসঙ্গে বঙ্গবিডির পরিচালক নাভেদুল হক বলেন, বিশ্বে করোনার ভয়াবহ পরিস্থিতি দেখে আমরা ১৬ মার্চ সিদ্ধান্ত নিয়ে ‘Work from home’ ঘোষণা দিয়েছি। আগামী দুই সপ্তাহ আমাদের কর্মীরা ভার্চুয়াল অফিস ব্যবস্থাপনার মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠানের কর্মকান্ড চালিয়ে যাচ্ছে বিভিন্ন অনলাইন প্রযুক্তির মাধ্যমে।

এবিকে টেক ভেন্সার এর ফাউন্ডার সোনিয়া বশির কবির বলেন, আমাদের কর্মচারীরা হোম অফিস করছেন। কারণ এমন পরিস্থিতিতে আমাদের প্রতিষ্ঠানের কোনো প্রকার ঝুকির মধ্যে কাজ করার পলেসিতে বিশ্বাস করেনা। কর্মীরাই হচ্ছে যেকোনো প্রতিষ্ঠানের প্রাণ তাই আমরা হোম অফিস ঘোষনা করেছি।

এ্যাডভান্স ইআরপি বাংলাদেশ এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোস্তাফিজুর রহমান সোহেল বলেন, আমরাও আমাদের প্রতিষ্ঠানের কাজ কর্ম বাসা থেকে চালু করে দিয়েছি।

একবিজ এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক জুবায়েদা সুলতানা, স্কাইলার্ক সফট লিমিটেড এর সিইও বি এম শরিফ, ফ্রিড ইন্টেলিজেন্টস লিমিটেড এর ফাউন্ডার সিইও লিও বিজয়, ইউমিডিজি মোবাইল বাংলাদেশ এর সিইও এবিএম ওবায়েদুল্লাহ বাদল বলেন, আমরা কিছু পরিকল্পনা ও কাজের লিস্ট অনুযায়ী ডিংটক, উইচ্যাট, ম্যাচেন্জার এর মাধ্যমে আমাদেও প্রতিদিনের কায্যক্রম পরিচালনা করে যাচ্ছি।

এ ছাড়া, আমারপে এর ফাউন্ডার ও ম্যানেজিং পার্টনার এ এম ইশতিয়াক সরওয়ার এবং একজনহোস্ট এর ফাউন্ডার মাছুমুল হক বলেন, আমরাও ওয়ার্ক ফরম হোম পলিসিতে আমাদের কায্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছি।

স্টার কম্পিউটার সিস্টেমস লিমিটেডের সিইও রেজওয়ানা খান বলেন, আমরাও বাসা থেকে নিজের নিরাপদে থেকে কর্মীদের কাজ বলেছি।

টাইকন সিস্টেম লিমিটেড এর ফাউন্ডার সিইও এমএন ইসলাম বলেন, আমরা ১৮ মার্চ থেকে হোম অফিস শুরু করে দিয়েছি।
সিনেসিস আইটির সাদ্দাম হোসেন বলেন, আমরা আগামী শনিবার থেকে হোম অফিস শুরু করবো।

ব্যাবিলন রিসোর্সেস লিমিটেড ও নিউজেন টেকনোলজি লিমিটেড এর সিইও লিয়াকত হোসেন বলেন, আমরা আমাদের কমীদের সেফটির কথা চিন্তা করে আগামী ৩১ তারিখ পর্যন্ত হোম অফিস ঘোষণা করে দিয়েছি, সাথে আমাদের কাস্টমারদের জন্য নিরবিচ্ছিন্ন সার্ভিস নিশ্চিত করেছি। এটি আমাদের জন্য সম্পূর্ণ নতুন অভিজ্ঞতা, ভবিষ্যতে যে কোনো দুর্যোগ কালীন সময়ে এই অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে পারবো।

দি ডাটাবিজ সফটঅয়্যার এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও রাশেদ কামাল বলেন, আমরা যেহেতু অনেক পুরাতন প্রতিষ্ঠান তাই গ্রাহকদের সার্ভিস-সাপোর্ট এর বিষয়টা অত্যান্ত গুরুত্ব রেখে আমাদের কর্মীদের গতকাল থেকে হোম অফিস করতে নির্দেশ দিয়েছি।

গতকাল আমি একটা ফেসবুক পোস্ট করে জানতে চাইলে, প্রাইমেক্স ইনফোসিস এর সিইও আব্দুল্লাহ আল মামুন রাসেল, ঢাকা ডিস্ট্রিবিউশন এর রাশেদ জামান, সাউথ টেক, ড্রিম ডিভাইসের ফজলে রাব্বি, বিজমোশন লিমিটেড এর সিইও মো: আশরাফ হোসেন রনি, নুসরাটেক এর ফাউন্ডার নেয়ামত উল্ল্যাহ মহান, ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনার বিশ্ববিদ্যালয় এর প্রফেসর ও সিএমইডির ফাউন্ডার প্রেসিডেন্ট খোন্দকার আবদুল্লাহ আল মামুন ও পোর্টল্যান্ড এর এ্যাডভারটাউজিং এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন, আমরা ১৯ মার্চ থেকে আমাদের অফিসিয়াল কাজ-কর্ম রিমোটলি করার সিদ্বান্ত গ্রহন করেছি।

ডিভাইন আইটি লিমিটেড এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইকবাল আহমেদ ফখরুল হাসান রাসেল বলেন, আমাদের দৈনন্দিন কাজের ৭০-৮০ শতাংশ হোম অফিসের মাধ্যমে পরিচালনা করে যাচ্ছে। কারণ আমাকে পরিস্থিতির কথা বিবেচনায় রেখেই গ্রাহক ও কর্মচারীদের সেবা ঠিক রাখেতে হচ্ছে। আমরা সরকারি সংস্থাগুলোতে সাপোর্ট টিম যারা আগে থেকেই কাজ করছে তাদের সরানোর এখনো কোনো পরিকল্পনা নেই। পাশাপাশি আমাদের প্রতিষ্ঠানে যারা ১ বছরের বেশী সময়ের কর্মচারী তারা হোম অফিস করলেও তাদের পিসি মনিটরিং সিস্টেমের মধ্যে কাজ করতে হচ্ছে। আমাদের এখনো ৩০ শতাংশ লোকবলকে অফিস ও মাঠে ময়দানে কাজ করাতে হচ্ছে। হোম অফিস ব্যবস্থা দেশে করোন পরিস্থিতির উপর নির্ভর করে কমানো বাড়ানো হবে।

বিদেশী প্রতিষ্ঠান আসুস বাংলাদেশ এবং বাংলা ট্রিবিউন এর মতো আনলাইন মিডিয়া ও হোম অফিস দিয়ে পরিচালিত হচ্ছে।

এদিকে আজ শুক্রবার তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমদ পলক এর উদ্যোগে আয়োজিত এক ডিজিটাল ভিডিও কনফারেন্সিংয়ে মাধ্যমে দেশের করোনা পরিস্থিতে প্রযুক্তির ব্যবহারে আমাদের দেশ ও জনগকে কি ভাবে যুক্ত করে পিজিক্যাল কাজ-কর্ম থেকে বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবেলা করা যায় সে বিষয়ে মিডিয়া ও স্টেক হেল্ডারদের সাথে অনলাইনে প্রায় ৩ ঘন্টার বেশী সময় মত বিনিময় সভার আয়োজন করেন।

 

-গোলাম দাস্তগীর তৌহিদ/২০মা./২০

 

 

Please Share This Post.