কম্পিউটার সায়েন্স গ্র্যাজুয়েটদের জন্য প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ

নাবিলা ইরতিজা : কম্পিউটার সায়েন্স গ্র্যাজুয়েটদের চাহিদা আবার বাড়ছে। গত বছর যুক্তরাষ্ট্রে কম্পিউটার বিজ্ঞানে স্নাতক ডিগ্রিপ্রাপ্ত শিক্ষার্থীদের ৭৬ ভাগই পড়াশোনা শেষ করার ছয় মাসের মধ্যে চাকরি পেয়েছে। স্নাতক ডিগ্রিধারীদের মধ্যে অন্য যে কোনো বিষয়ের তুলনায় এই হার সর্বোচ্চ। এই তথ্য জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের ‘ন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন অব কলেজেস অ্যান্ড এমপ্লয়িস’। তবে প্রযুুক্তিখাতের বিশেষজ্ঞদের মত হচ্ছে, চাকরি পাওয়া আর চাকরিতে টিকে থাকা এক কথা নয়। তার চেয়েও বড় কথা হচ্ছে, কম্পিউটার বিজ্ঞানে সার্টিফিকেট হাতে থাকলেই চাকরি এসে নিজে নিজে ধরা দেবে না। শিক্ষা জীবন শেষ করে পেশাগত জীবনে প্রবেশ করা মানুষের জীবনে বড় এক মোড় পরিবর্তনের সূচনা করে। কম্পিউটার বিজ্ঞানের স্নাতকদের তাই নতুন এই জীবনের জন্য পূর্বাহ্নেই প্রস্তুতি গ্রহণ করতে হবে। পেশাগত জীবনে উন্নতি করার জন্য কম্পিউটার বিজ্ঞান গ্র্যাজুয়েটদের কী কী করতে হবে সে ব্যাপারে নামীদামী কিছু কম্পিউটার বিশেষজ্ঞ কিছু পরামর্শ দিয়েছেন। সেসব পরামর্শ অনুযায়ী চললে এসব শিক্ষার্থী পেশাগত জীবনে উৎকর্ষের স্বাক্ষর রাখতে পারবেন এটা আশা করা যায়।

 

কাজ করতে হবে আনন্দ নিয়ে
স্কাইলিংক ডাটা সেন্টারের চিফ টেকনোলজি অফিসার জ্যাকব অ্যাকারম্যান মনে করেন, কাজের মধ্যে আনন্দ খুঁজে পাওয়া গেলে পেশাগত জীবনের যে কোনো চ্যালেঞ্জকেই মোকাবেলা করা যাবে। তিনি বলেন, ‘চাকরিতে থাকাকালীন মনের মধ্যে যত প্রশ্ন আসে সেগুলো জিজ্ঞেস করতে কোনো দ্বিধা করা উচিত নয়। চাকরিতে নতুন ঢুকেছে এমন অনেককেই দেখি, কোনো কিছু না জানলে সেটি জিজ্ঞেস করতে দ্বিধা করে। আমি ১৮ বছর ধরে প্রযুক্তি ক্ষেত্রে আছি এবং এখনও কিন্তু প্রশ্ন জিজ্ঞেস করছি এবং নতুন জিনিস শিখছি।’

 

জ্ঞানের ঘাটতি থাকলে স্বীকার করুন ও শিখুন
পিয়েরে ট্রেম্বলি নামে আরেক প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্জিত জ্ঞান কখনোই আপনাকে কর্মক্ষেত্রের জন্য শতভাগ প্রস্তুত করবে না। প্রযুক্তির সংস্কৃতির সঙ্গে নিজেকে খাপ খাওয়ানোর একমাত্র উপায় হচ্ছে জ্ঞান। কীভাবে CSS-কে ঠিকমত ব্যবহার করতে হবে বা JS script লিখতে হবে তা না জানলে অফিসে হাস্যাস্পদ বলে গণ্য হবেন। কাজেই এসব জ্ঞান আয়ত্ত করতে হবে। মনে রাখতে হবে, জ্ঞানের ঘাটতি স্রেফ সাময়িক একটা ব্যাপার। কাজেই নিজের মধ্যে কৌতূহলকে জাগিয়ে রাখতে হবে সবসময়। নতুন নতুন জিনিস জানার চেষ্টা আপনার মধ্যে দায়িত্বশীলতার জন্ম দেবে। এটা থেকে পালিয়ে থাকা বা দূরে থাকা কোনো কাজের কথা নয়। কাজেই স্রোতের সঙ্গে চলুন, একসময় দেখবেন আপনিই স্রোতকে নিয়ন্ত্রণ করছেন।’

 

পরিচিতদের নেটওয়ার্ক তৈরি করুন
আজকের এই তারুণ্যনির্ভর, দ্রুতগতির এবং স্বাতন্ত্রনির্ভর সমাজেও সমমনাদের সাথে নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার কোনো বিকল্প নেই। ‘Built.io’-এর সিটিও নিশান্ত প্যাটেল-এর পরামর্শ হচ্ছে, ‘হ্যাকাথনে যোগ দিন, সামাজিক যোগাযোগে সম্পৃক্ত হোন, নানারকম ফোরামে যুক্ত হন। যার যার সঙ্গে কথা বলছেন, দেখা করছেন তাদের প্রত্যেকেই আপনার জন্য একটি সম্পদ হিসেবে আবির্ভুত হতে পারে। সেটা আজ না হলেও পাঁচ বছর বা দশ বছর পর অবশ্যই হতে পারে। আজ থেকে কয়েক বছর পর আপনি যদি আবার চাকরির বাজারে নামেন তখন একসময় ডেভেলপার হিসেবে সহকর্মী ছিল এমন যে কেউ আপনার কাজে আসতে পারে।’

 

নিজের ল্যাব গড়ে তুলুন
ভায়াওয়েস্ট-এর নেটওয়ার্ক সার্ভিসেস-এর ভাইস প্রেসিডেন্ট টিম পার্কার নেটওয়ার্কিং শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে বলেন, ‘যেরকমই হোক, নিজের একটি ল্যাব গড়ে তোলা উচিত যেখানে নিজের দক্ষতা ও জ্ঞান নিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা করা যাবে। এটা শুধু নিজের উৎকর্ষ বৃদ্ধিতেই সহায়তা করবে না, সিসকো সার্টিফায়েড নেটওয়ার্ক অ্যাসোসিয়েটস বা সিসিএনএ ধরনের ইন্ডাস্ট্রি সার্টিফিকেশন পাওয়ার ক্ষেত্রেও প্রচুর সাহায্য করবে।’ তিনি মনে করেন, চাকরির ইন্টারভিউর ক্ষেত্রেও এটি কাজ দেবে। তিনি নিজে চাকরি দেয়ার ক্ষেত্রেও ল্যাব পরিচালনার অভিজ্ঞতা আছে এমন মানুষকে চাকরি দিয়েছেন বলে জানান।

 

অংশ নিন ও ভূমিকা রাখুন
প্রযুুক্তি বিশেষজ্ঞ অমৃত কুমার মনে করেন, অংশগ্রহণের কোনো বিকল্প নেই। বিশেষ করে ওপেন সোর্স কমিউনিটিগুলোতে অংশগ্রহণ করা গেলে শেখা যাবে নতুন অনেক কিছু। এর ফলে যে কেবল তাদের কম্পিউটার বিজ্ঞানের দক্ষতা বাড়বে তাই নয়, বাড়বে অন্যের সঙ্গে যোগাযোগের দক্ষতাও। তিনি বলেন, ‘কম্পিউটার সায়েন্সের কোন ক্ষেত্রটিতে আপনি সম্পৃক্ত হতে চান তাতে কিছু আসে যায় না, একটু খুঁজলেই এটার ওপর অন্তত ছয়-সাতটা ওপেন সোর্স প্রজেক্ট পেয়ে যাবেন অনলাইনে। এসব প্রজেক্টে অংশ নিন, অবদান রাখার চেষ্টা করুন। দেখবেন, আপনি চাকরি খোঁজার আগেই কোম্পানিগুলো চাকরির অফার নিয়ে আপনার কাছে হাজির হয়ে গেছে।’

 

সমস্যা সমাধানের দক্ষতা অর্জন করুন
ন্যাশনাল ল্যান্ড রিয়েলটি নামে একটি প্রতিষ্ঠানের সিটিও অ্যান গ্যাফিগান পরামর্শ দিয়েছেন সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা অর্জন করার। তিনি বলেন, ‘চাকুরিদাতা প্রতিষ্ঠানগুলো জানতে চাইবে, আপনার চিন্তাভাবনার ধরনটি কী রকম এবং আপনি কীভাবে সমস্যা সমাধান করেন। ইন্টারভিউর সময় তারা আপনাকে কোনো একটা কাল্পনিক পরিস্থিতি (সিনারিও)-র কথা বলবে এবং আপনি কীভাবে সেটি সমাধান করবেন তা জানতে চাইবে। সমস্যা সমাধানের প্রক্রিয়াটার মধ্য দিয়ে আপনি কীভাবে এগোচ্ছেন, সঠিক পয়েন্টগুলো চিহ্নিত করতে পারছেন কিনা এবং শেষমেষ উপসংহারে পৌঁছাতে সক্ষম হচ্ছেন কিনা এটাই তারা বুঝতে চাইবে।’

 

কাস্টমার সার্ভিস সংক্রান্ত দক্ষতা বাড়ান
পেশাগত জীবনে তিনিই সফল হতে পারেন, যিনি প্রতিষ্ঠানের গ্রাহক ও সেবাগ্রহীতাদের ঠিকমত সামলাতে পারেন। এ সম্পর্কে ইবক্সল্যাব (ঊনড়ীষধন)-এর সোশ্যাল মিডিয়া ম্যানেজার আরিয়ানা জালেহ বলেন, ‘আমরা দেখেছি, কম্পিউটার বিজ্ঞানে সবে স্নাতক  ডিগ্রি সম্পন্ন করেছে এমন তরুণদের দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা প্রায় একই। কাজেই চাকরির জন্য লোক খোঁজার সময় অন্যান্য ব্যাপারে মনোযোগ দিই আমরা। বিশেষ করে সেবাগ্রহীতা তথা কাস্টমারদের নিয়ে কাজ করার অভিজ্ঞতা আছে বা কাজ করতে পারবে এমন চাকরিপ্রার্থীদের প্রাধান্য দিই আমরা। বিশেষ করে নিজের ওপর বিশ্বাস আছে, কিন্তু বিনয়ী- এমন প্রার্থীরা চাকরিক্ষেত্রে ভালো করতে পারে। মনে রাখতে হবে, শেখার আছে অনেক কিছুই। সমালোচনা সহ্য করেও নতুন নতুন বিষয় শেখার ব্যাপারে যাদের আগ্রহ আছে তারাই শেষ পর্যন্ত ভালো করতে পারবে।’

 

– সিনিউজভয়েস ডেস্ক

Please Share This Post.