কম্পিউটার প্রোগ্রামিং ও মস্তিষ্ক: সম্পর্কের নতুন রসায়ন

কোনো সন্দেহ নেই, মানুষের শরীরের সবচেয়ে রহস্যময় অংশ হল মস্তিষ্ক তথা ব্রেইন। মস্তিষ্ককে নিয়ে শত শত গবেষণা হয়েছে। তবু আমরা এখনও পুরোপুরি বুঝতে পারিনি এটি কীভাবে কাজ করে। অনেকেই মনে করেন, ধাঁধাঁ সমাধান বা জ্ঞানচর্চার কাজ করলে মস্তিষ্ক ভাল থাকে। ধাঁধাঁ সমাধানকে তাই বুদ্ধির ব্যায়াম বলেও আখ্যায়িত করেন অনেকে। তবে বিনা তর্কে এটি মেনে নিতেও আপত্তি আছে অনেকের। তাঁরা মনে করেন, পরিবেশগত ও জেনেটিক ফ্যাক্টরই এখানে বড় কথা। যাই হোক, সাধারণভাবে এটা মনে করা হয় যে মানসিক কর্মকান্ড আমাদের মস্তিষ্ককে সতেজ রাখে। আর এখানেই আসে প্রোগ্রামিংয়ের কথা। কোনো কোনো গবেষক বলছেন, মানুষের ব্রেইনকে সতেজ রাখার ক্ষেত্রে যে কয়েকটি কাজ অগ্রগণ্য বলে বিবেচিত হতে পারে তার মধ্যে কম্পিউটার প্রোগ্রামিং একটি।

মানুষের কাজের তালিকায় প্রোগ্রামিং কিন্তু খুবই নতুন একটি কাজ। যুক্তি ও যুক্তিতর্কের চর্চা মানুষ শত সহস্র বছর ধরে করে আসছে- কিন্তু টুকরো টুকরো কোড লেখার মাধ্যমে কম্পিউটারকে কাজের নির্দেশ দেয়ার ব্যাপারটি এল এই সেদিন। প্রশ্ন উঠতে পারে, প্রোগ্রাম লেখা কীভাবে আমাদের ব্রেইনের উপকার করতে পারে? তানিশিয়া মরিস (Tanisia Morris) নামে এক গবেষক এক নিবন্ধে কোডিং ও মানুষের জ্ঞানচর্চার দক্ষতার মধ্যে সম্পর্কটি বিশ্লেষণ করেছেন। তিনি বলেন, ‘গবেষণায় দেখা গেছে, মস্তিষ্কের চর্চা আমাদের ব্রেইন ফাংশনকে উন্নত করতে পারে এবং সম্ভবত উন্মাদনার মত রোগ থেকেও মুক্ত রাখতে পারে।’ অবশ্য এক্ষেত্রেও উভয়ের মধ্যে শতভাগ প্রমাণিত কোনো সম্পর্ক তিনি দেখাতে সমর্থ হননি। বরং ‘সম্ভবত’ শব্দটি ব্যবহার করে এখানে একটা ফাঁক রেখে দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘মস্তিষ্ককে তরতাজা রাখার একটি উপায় হচ্ছে নতুন দক্ষতা অর্জন করা। গত বছর যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব টেক্সাসের গবেষকরা গবেষণা করে দেখেছেন, আগে কখনও করেননি এমন চ্যালেঞ্জিং কাজ করলে আপনার মস্তিষ্কের ক্ষমতা বাড়ে।’ মানুষ যতদিন বেঁচে থাকে, তার মস্তিষ্ক ক্রমশই নতুন নতুন বিষয় আবিষ্কার করতে এবং জানা প্রপঞ্চগুলোর মধ্যে নতুন সম্পর্ক আবিষ্কার করতে থাকে। আর এ কাজে মনকে সক্রিয় রাখে এমন যে কোনো কাজই সাহায্য করে। সেটি হতে পারে বই পড়া, ধাঁধাঁ সমাধান করা, সুডোকু মেলানো ইত্যাদি। আর এখানেই আসে প্রোগ্রামিংয়ের কথা। প্রোগ্রামিং করতে শেখা এবং প্রোগ্রামিংয়ের চর্চা করাও মানুষের মনকে সক্রিয় রাখে। তার মস্তিষ্কের সক্ষমতাকেও ক্রমশ বাড়াতে থাকে।

অনেকেই মনে করেন, প্রোগ্রামিং অনেকটা অংক করার মত এবং মানুষের মস্তিষ্কের যে অংশে অংক করার কাজ হয় প্রোগ্রামিংয়ের কাজও হয় সেখানেই। তবে মজার ব্যাপার হচ্ছে, সাম্প্রতিক সময়ের কোনো কোনো গবেষণায় বরং প্রমাণিত হয়েছে, প্রোগ্রামিংয়ের কোড লেখার সঙ্গে বরং সাদৃশ্য আছে মানুষের মানবীয় ভাষা প্রক্রিয়াকরণের (processing human languages) সক্ষমতার সঙ্গে। যুক্তরাষ্ট্রের খ্যাতনামা কম্পিউটার লেখক জ্যাক ডানিং-এর কথা বলা যাক। ডানিং এ বিষয়টি নিয়ে লেখালেখি করেন।

তিনি বলেন, ‘আমি নিজেকে বিশেষজ্ঞ প্রোগ্রামার বলে মনে করি না। প্রোগ্রামিংয়ের কাজটি আমি পুরোপুরিভাবেই নিজের চেষ্টায় শিখেছি এবং ব্যক্তিগত ও পেশাগত কাজে বেশ কিছু প্রোগ্রাম তৈরি করেছি। আমি লক্ষ করেছি, যখন আমি কোনো কোডিং সমস্যার ওপর কাজ করি তখন এক ধরনের জাদুবাস্তবতাময় অভিজ্ঞতা অনুভব করি। এটি অনেকটা ভাল কোনো বই পড়ার সময় মনের যে অবস্থা হয় তার সঙ্গে তুলনীয়। তবে বই পড়ার সময় বইয়ের সঙ্গে আমার ইন্টার‌্যাকশনের দরকার হয় না, প্রোগ্রামিং করার সময় হয়। বই পড়ার সময় আপনি এ মুহূর্তের বাস্তবতা থেকে বইয়ের পাতায় লুকানো অন্য এক জগতে চলে যান। এসময় কেউ আপনাকে ডাকলে তার ডাক আপনি নাও শুনতে পারেন। এটি এমন একটি বিশ্ব যা বাইরের দুনিয়াকে পুরোপুরি নাকচ করে দেয় এবং আপনাকে ঘিরে বিচ্ছিন্নতার একটি দেয়াল তৈরি করে। এভাবে ঘণ্টার পর ঘণ্টাও কেটে যেতে পারে। প্রোগ্রামিং করার সময়ও এ ধরনের পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।’

জ্যাক ডানিং আরো বলেন, ‘প্রোগ্রামিং বা কোডিং করার সময় আমি যেভাবে চিন্তা করি তা অনেকটা এরকম: “এটা কাজ করল না”, “এটাও কাজ করল না”, “এই তো, এটা কাজ করেছে!” “কিন্তু একটু আগে যেটা কাজ করেছিল এখন দেখি সেটা কাজ করছে না” …. আসলে প্রোগ্রামিংয়ের সময় যে মিথস্ক্রিয়াটি ঘটে সেটি বই পড়া নয়, অনেকটা বই লেখার মত। সিনট্যাক্সের প্রতিটি লাইনই একটি সংলাপের মত, যেটি বইয়ের আখ্যানের সাথে যুক্ত হচ্ছে। চূড়ান্ত সন্তুষ্টি আসবে যখন কম্পিউটারকে দিয়ে যা করাতে চাইছিলেন তা করাতে পারেন। অথচ মুশকিল হচ্ছে, তখনও বইটি যেন পুরোপুরিভাবে শেষ হয়নি! প্রোগ্রামিংয়ের সময় মানুষের মানসিক অবস্থাকে বর্ণনা করা ক্ষেত্রে গভীর মনোযোগ সবচেয়ে সেরা পন্থা হতে পারে। সমস্যা জটিল বা সহজ যাই হোক, আপনার পুরো মনোযোগ তাতে নিবদ্ধ করতে পারার মধ্যেই প্রোগ্রামিংয়ের সার্থকতা। এখানে উদ্দেশ্য একটাই: ফল পাওয়া। কাজে অগ্রগতি ঘটলে, অর্থাৎ সমস্যার সমাধান শুরু হলে প্রোগ্রাামার বহির্বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যান। কোনোকিছুই তখন আর তাঁর মাথায় থাকে না। সমস্যাটার শেষ দেখে ছাড়াকেই তিনি পাখির চোখ করে এগোতে থাকেন। টিভি দেখা, প্রতিবেশীর সাথে গল্প করা, গাড়ি চালানো বা গান শোনার মত কাজের চেয়ে এটি একেবারেই ভিন্ন একটি কাজ।

এ কারণেই বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দিচ্ছেন, আপনার পেশা যাই হোক, প্রোগ্রামিং শিখুন। প্রোগ্রামিং শিখলে কম্পিউটার কীভাবে কাজ করে সে ব্যাপারে আপনার জ্ঞান বাড়বে। আপনি যে পেশাতেই থাকুন না কেন, আপনার পেশাগত সুনাম এবং দক্ষতাও বাড়বে। বিশেষ করে আপনার অফিসের কম্পিউটার বিশেষজ্ঞ ও প্রোগ্রামাররা যখন টিমি মিটিংয়ে কথা বলবে তখন তাদের কথা বুঝবেন এবং আলোচনায় অংশ নিতে পারবেন। আপনার যে এক্সপার্ট প্রোগ্রামার হবার দরকার নেই, তবে কম্পিউটার প্রোগ্রাম কীভাবে কাজ করে তা জানার মাধ্যমে নিজের মস্তিষ্কের সক্ষমতাকে নিশ্চিতভাবেই বাড়িয়ে তুলতে পারবেন আরো একটুখানি।

-ইন্টারনেট অবলম্বনে/সিনিউজভয়েসডেক্স/২৯জুলাই/১৯

 

Please Share This Post.