অ্যাফিলিয়েট মার্কেটিং নিয়ে সি নিউজের মুখোমুখি আরিফুল ইসলাম


বর্তমানে বাংলাদেশে অ্যামাজন অ্যাফিলিয়েট মার্কেটিং এ যেকয়জন সফল ব্যক্তিত্ব আছেন তাদের মধ্যে অন্যতম আরিফুল ইসলাম পলাশ। বর্তমানে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত। টুকটাক লেখালেখির পাশাপাশি বই পড়া, নতুন জিনিস জানার প্রতি ব্যাপক আগ্রহ রয়েছে তার। ভবিষ্যতে দেশের অন্যতম একজন ব্যবসায়ী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চান নিজেকে। সম্প্রতি মাসিক সি-নিউজ থেকে সৈয়দ মোহাইমিনুল অ্যাফিলিয়েট মার্কেটিং এর বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কথা বলেন আরিফুল ইসলাম পলাশ এর সঙ্গে। এখানে সাক্ষাতকারের উল্লেখযোগ্য অংশ পাঠকের জন্য তুলে ধরা হলো।

 * অ্যামাজন অ্যাফিলিয়েট মার্কেটিং এ আসার পেছনের গল্প বলুন

স্কুলে পড়ার সময় থেকেই তথ্যপ্রযুক্তির প্রতি আমার আগ্রহ ছিল কিন্তু তেমন একটা ধারণা ছিল না। আমার সহপাঠী অনেকে এ ব্যাপারে বেশ ভালো জানত, ওরা কম্পিউটার, ইন্টারনেট, অনলাইনের বিভিন্ন কাজ নিয়ে আলোচনা করত। কিন্তু না জানার কারণে ওদের সঙ্গে সেভাবে মিশতে পারতাম না, নিজের মধ্যে হীনমন্যতা কাজ করতো। তখন মনে একটা জেদ আসলো যে আমি ওদের থেকেও ভালোভাবে জানব, শিখব। এরপরে এক বন্ধুর সহায়তায় সাইবার ক্যাফে যাওয়া শুরু করলাম, প্রযুক্তি বিষয়ক বই, ম্যাগাজিন পড়া শুরু করলাম বিশেষ করে তখন সি-নিউজ রেগুলার পড়তাম। এক সময় আমার প্রচণ্ড আগ্রহ দেখে বাবা একটি কম্পিউটার কিনে দিলেন। ঘাটাঘাটি করতে করতে একসময় আমার ভালো ধারণা হয়ে গেল এবং জানতে পারলাম যে অনলাইনে কাজ করে বাসায় বসেই ইনকাম করা যায়। অনলাইন গুরু জন চো, ইয়ারো স্টারাক , অমিত আগারওয়ালকে ফলো করতাম সেসময়। প্রথমে ফ্রিল্যান্স রাইটার হিসেবে মার্কেটপ্লেসে কাজ শুরু করলাম। সেখানে বেশ সফলতা ছিল আমার। এরপর অ্যাডসেন্স নিয়ে কাজ করলাম। আমি ক্লাস নাইনে পড়া অবস্থায় প্রথম অ্যাডসেন্সের চেক আসে আমার। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সময় থেকে অ্যাফিলিয়েট মার্কেটিং শুরু করি।

* অ্যাফিলিয়েট মার্কেটিং আসলে কি?

আপনি যখন একজন অ্যাফিলিয়েট মার্কেটার, তখন অন্যের প্রোডাক্ট মার্কেটিং করে বিক্রি করিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে আপনি কমিশন পাবেন। অর্থাৎ, আপনার কোনো প্রোডাক্ট নেই, প্রোডাক্ট আরেকজনের। তার প্রোডাক্ট আপনি সেল করে দিবেন, তার বিনিময়ে সেই প্রোডাক্টের দামের একটা অংশ আপনাকে দেওয়া হবে।

অনলাইনে এটা খুবই পপুলার একটা সেলস স্ট্র্যাটেজি প্রডাক্টের বিক্রি বাড়ানোর জন্যে। আর এদিক থেকে পিছিয়ে নেই অ্যামাজনও। তারা তাদের সাইটে থাকা প্রোডাক্টের বিক্রি বাড়ানোর জন্যে এমন একটা প্রোগ্রাম তৈরি করেছে। যেটার নাম – অ্যামাজন অ্যাসোসিয়েটস প্রোগ্রাম। অনলাইনের প্রথম দিককার অ্যাফিলিয়েট প্রোগ্রামগুলোর মধ্যে এটি একটি। প্রায় এক যুগ যাবৎ তারা সফলভাবে এটি পরিচালিত করে আসছে।

আরো সহজে বললে- অ্যামাজনে কোটি কোটি প্রোডাক্টের মধ্যে আপনি আপনার পছন্দ অনুযায়ী প্রোডাক্ট প্রোমোট করবেন, সেল করতে পারলে সেই প্রোডাক্টের দামের একটা নির্দিষ্ট অংশ পাবেন। সেই অংশ কতো সেটা নির্ভর করে আপনার বিক্রির পরিমাণের ওপর।

* অ্যাফিলিয়েট মার্কেটিং এর ভালো দিকগুলো কি?

ঘরে বসেই স্মার্ট ইনকাম করা যায় এবং আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে বেশ ভালো অ্যামাউন্টের ইনকাম করা যায়।  অনেক নতুন নতুন বিষয়ে জ্ঞান অর্জন হয়। যেমন আমি যদি ফিশিং রিলেটেড পণ্য নিয়ে কাজ করি তাহলে সেই টপিকের ওপর বিস্তর ধারণা চলে আসে কাজের মাধ্যমেই, যেটা সম্পর্কে আগে জানতাম না। আর কাজ করতে যেয়ে এই কমিউনিটির অনেকের সঙ্গে খুব ভালো সম্পর্ক তৈরি হয়ে যায়। কাজ করতে করতে এরকম অনেকেই আমার কাছের মানুষ হয়ে গেছে যেমন মিনহাজ ভাই, রফিক যেটা হয়তো অ্যামাজন অ্যাফিলিয়েট সেক্টরে কাজ না করলে সম্ভব হতনা।

* অ্যাফিলিয়েট মার্কেটিং এ আপনার প্রথম আয় হয় কখন?

অনলাইনে কাজ করে অনেক আগে থেকেই আমি আয় করি। অ্যাফিলিয়েট মার্কেটিং এ আমার প্রথম আয় ২০১২ তে।  কিন্তু অ্যামাজন অ্যাফিলিয়েট মার্কেটিং এ আমার প্রথম আয় হয় প্রথম সাইট চালু করার ২.৫ মাসের মাথায় ২০১৫ সালে।

* অর্থনৈতিক দিক ছাড়াও অ্যাফিলিয়েট মার্কেটিং আপনার জীবনে কি ধরনের প্রভাব ফেলেছে?

আমি যেহেতু বই পড়তে খুব ভালোবাসি, এই সেক্টরে কাজ করতে যেয়ে প্রচুর পড়াশোনা করার কারণে নতুন অনেক বিষয় সম্পর্কে জানতে পারছি। আমার জ্ঞানের পরিধি বাড়ছে। এছাড়া এই সেক্টরে নতুনদের সহযোগিতা করার সুযোগ পাচ্ছি। জাতীয় এবং আন্তর্জাতিকভাবে অনেক ব্যাক্তিকে হাতে ধরে কাজ শিখিয়ে দেয়ার মাধ্যমে তাদের আত্মনির্ভরশীল করে তুলতে পারছি। ফলে বয়সে ছোট হলেও বিভিন্ন জায়গা থেকে প্রচুর সম্মান পাই যা আমার জন্য সবচেয়ে বড় অর্জন।

* আপনিতো অনেকগুলো ওয়েবসাইট তৈরি করেছেন। নতুন সাইটের জন্য নিশ এবং পণ্য বাছাইয়ের ক্ষেত্রে কোন স্ট্র্যাটেজি ফলো করেন?

আমি এমন নিশ খুঁজে বের করি যা স্যাচুরেটেড না অর্থাৎ খুব বেশি মার্কেটার ওই নিশ নিয়ে কাজ করছে না। যেটা স্বাভাবিকভাবে খুব সহজেই র‍্যাংক করা যায়। যেখানে আমি নুন্যতম পরিশ্রম দিয়ে সর্বোচ্চ ফলাফল নিয়ে আসতে পারবো ।

আর পণ্য বাছাইয়ের ক্ষেত্রে অ্যামাজনের সেলস র‍্যাংক, কাস্টমার রিভিউ (কত সময় পর পর রিভিউ হচ্ছে), আর মূল্য খেয়াল করি। নুন্যতম ৫০ ডলার বা এর বেশি মূল্যের পণ্য নিয়ে কাজ করি। তবে আগে আমি কিওয়ার্ড রিসার্চ করি তারপর পণ্য নির্বাচন করি। আর কিওয়ার্ড রিসার্চেই মূলত আমি সবচেয়ে বেশি জোর দেই কারণ এর ওপরেই সফলতা অনেকখানি নির্ভর করে।

* ওয়েবসাইট তৈরি এবং কনটেন্ট এর ক্ষেত্রে কোন স্ট্র্যাটেজি ফলো করেন?

সাইট তৈরি করার ক্ষেত্রে আমি ওয়ার্ডপ্রেসের পেইড থিম, প্লাগিন ব্যবহার করি। আর ডোমেইন নির্বাচনের ক্ষেত্রে ফ্রেশ আর এক্সপায়ার্ড  দুই ধরনেরই ডোমেইন ব্যবহার করি। এবং খুব ভালো হোস্টিং কোম্পানির সার্ভিস নিয়ে থাকি যাতে আমার সাইটের ভিজিটর বেস্ট এক্সপেরিয়েন্স পায়।

কনটেন্ট যেহেতু একটা সাইটের প্রাণ তাই আমি সবসময় চেষ্টা করি আমার ভিজিটরদের জন্য ভ্যালু এ্যাড করতে। সচরাচর সবাই সাইটে ৮০-৯০ % মানি কনটেন্ট (যেখান থেকে সরাসরি ইনকাম আসে) দেয়। এটা একজন ইউজারের জন্য ভালো এক্সপেরিয়েন্স হবে না। আমি ৬০-৭০ শতাংশ ইনফরমেশনাল কনটেন্ট দেই আর বাকিটা থাকে মানি কনটেন্ট। এটা একজন ইউজারের জন্য যেমন ভ্যালু এ্যাড করে ঠিক তেমনি সার্চ ইঞ্জিন থেকেও অথোরিটি পাওয়া যায়। আমি আমার সমস্ত কনটেন্ট আউটসোর্স করি। তবে একটা ধারণা ভুল যে ন্যাটিভ রাইটার হলেই যে সবাই ভালো হবে তা ঠিক না। কিছু কিছু রাইটার গারবেজ লেখা দেয়, যেটা ভালোভাবে চেক করে নেয়া উচিত। তবে সাধারণত ন্যাটিভ রাইটারদের থেকেই ভালো কন্টেন্ট পাওয়া যায়। আমার অবশ্য নিজস্ব রাইটার টিম আছে। কনটেন্ট ডেলিভারি পাওয়ার পর আমি বা আমার এডিটর সেটা রিভিউ করে পাবলিশ করি।

 * আপনার সাইটে ট্রাফিক ড্রাইভ করেন কিভাবে?

প্রধানত গুগলের মাধ্যমে অর্গানিক ট্রাফিক ড্রাইভ করি। সেক্ষেত্রে আমার লিংক বিল্ডিং স্ট্র্যাটেজি থাকে গেস্ট পোস্টিং, ওয়েব ২.০ লিংক বিল্ডিং, সোশ্যাল মিডিয়া মার্কেটিং, আর খুব কমক্ষেত্রে পিবিএন ব্যাবহার করি। সাধারণত কাজগুলো নিজে কিছু করি আর কিছু আউটসোর্স করি।

 * আপনার পছন্দের এ্যফিলিয়েট মার্কেটিং টুল এবং অনলাইন রিসোর্স কোনগুলো?

আমার ফেভারিট টুল

  • Ahrefs
  • Semrush
  • Majestic
  • Keywordtool.io

রিসোর্স

  • Blackhatworld
  • Inbound.org
  • Reddit
  • WarriorForum
  • Nichepursuits

* প্রত্যাশা অনুযায়ী একটি সাইট পারফর্ম না করলে কি করেন ?

যদি মনে করি বিনিয়োগ আর পরিশ্রম বাড়ালে রিটার্ন ভালো আসবে তাহলে সেটা করি আর যদি দেখি কম্পিটিটর অনেক বেশি শক্তিশালী তাহলে পিবিএন ইউটিলাইজ করি এবং সুপার লং টেইল কিওয়ার্ড নিয়ে কাজ করি যাতে অন্তত আমার বিনিয়োগটা উঠে আসে।

* বিগত কয়েক বছরে অ্যাফিলিয়েট মার্কেটিং সেক্টরে কি কি পরিবর্তন এসেছে এবং সেগুলোর সঙ্গে আপনি কিভাবে খাপ খাইয়েছেন ?

খুব সম্প্রতি অ্যামাজনের অ্যাফিলিয়েট মার্কেটিং এর কমিশন স্ট্রাকচারে পরিবর্তন এসেছে। একই ওয়েবসাইটের ইনকাম আগের চেয়ে কিছুটা কমেছে। সেটা ওভারকাম করার জন্য কাজের গতি বাড়িয়েছি, আগে স্পেসিফিক ছোট সাইট নিয়ে কাজ করতাম এখন আরো ব্রড সাইটের দিকে মনোযোগ দিচ্ছি। এছাড়াও অনেক ক্ষেত্রে সরাসরি ম্যনুফ্যাকচারারের সঙ্গে যোগাযোগ করে প্রমোশনের অফার দিচ্ছি যাতে দুই পক্ষেই উইন উইন সিচুয়েশন থাকে।

 * কোন উদ্যোক্তা/ব্যক্তি আপনাকে সবচেয়ে বেশি অনুপ্রাণিত করেছে এবং কেন?

স্টিভ জবস। স্রোতের বিপরীতে চলা একজন মানুষ যিনি তার জীবনের সবচেয়ে খারাপ দিকগুলো ফেস করছেন কিন্তু সফল হওয়ার জন্য প্রচণ্ড জেদ তাকে সাফল্যের চূড়ায় নিয়ে গেছে। উনার কাজের ধরনও সবার থেকে আলাদা। সফল হওয়ার জন্য উনার প্রচণ্ড ইচ্ছাশক্তির ব্যাপারটা আমাকে দারুণভাবে অনুপ্রাণিত করে।

* নতুনদের প্রতি আপনার পরামর্শ কি? এই সেক্টরে কোন ধরনের ব্যক্তিদের আসা উচিত?

যাদের জানার প্রচণ্ড আগ্রহ আছে, যাদের ইনভেস্ট করার মতো সামর্থ্য আছে এবং অবশ্যই ধৈর্য আছে। এটা কিন্তু কোনো গেট রিচ কুইক স্কিম না। সুতরাং ধৈর্য ধরে কঠোর পরিশ্রম করতে হবে। অনলাইনে নুন্যতম কাজের এক্সপেরিয়েন্স আছে এরকম ব্যক্তিরা এখানে ভালো করবে। তবে কাজ শুরু করার আগে অবশ্যই অ্যাফিলিয়েট মার্কেটিং সম্পর্কে খুব ভালোভাবে ধারণা নেয়া উচিত।

* অ্যামাজন অ্যাফিলিয়েট মার্কেটিং এর পরবর্তী গন্তব্য কি?

গত বেশ কয়েক বছরের তুলনায়, এখন অ্যাফিলিয়েট মার্কেটার এর সংখ্যা বেশি। আগের তুলনায় কাজ অনেক বেশি হচ্ছে। কম্পিটিশন বাড়ছে। যারা অল্প বাজেটে এই মার্কেটে আসবে তাদের টিকে থাকা কঠিন হয়ে যাবে। তবে সুযোগ একেবারেই থাকছে না, এমন না। এখনও এমন অনেক নিশ পরে আছে যেগুলো নিয়ে খুব বেশি মানুষ কাজ করেনি। আর আশা করা যায়, এই মার্কেটারদের কাজের গতি বাড়াতে অ্যামাজনও যুগোপযোগী উদ্যোগ নিবে, কারণ তাদের সেল এর সিংহভাগ অ্যাফিলিয়েট মার্কেটারদের কল্যাণেই হচ্ছে।

 * একজন অ্যাফিলিয়েট মার্কেটার হিসেবে সরকারের কাছে থেকে কি সহযোগিতা প্রত্যাশা করেন ?

বাইরে থেকে টাকা আনার ব্যাপারটাকে আরো সহজ করা দরকার। সরকারের প্রতি অনুরোধ থাকবে তারা যেন বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর সকল কর্মকর্তাদের এ ব্যাপারে পরিপূর্ণ একটা ধারণা দেয়ার জন্যে উদ্যোগ নেয়। সম্প্রতি আমাদের কমিউনিটির একজনকে একটি ব্যাংক টাকার উৎসের ব্যাপারে ২.৫ ঘণ্টা জেরা করেছে, যা দুঃখজনক।

 * দেশের অ্যাফিলিয়েট মার্কেটারদের কমিউনিটিতে কন্ট্রিবিউটের ক্ষেত্রে আপনার পরিকল্পনা কি?

ইতিমধ্যে ফেসবুক গ্রুপের ( AMZ affiliate Bangladesh সহ আরো) মাধ্যমে নতুনদের সহযোগিতা করছি। এছাড়াও আমার নিজস্ব একটি ব্লগ আছে (http://projuktigeek.com ), যেখানে বিভিন্ন টপিকের ওপর আমি নিয়মিত লিখি। ভবিষ্যতে এই বিষয়ের ওপর ভিডিও দেয়ার ইচ্ছা আছে।

* আপনার ভবিষ্যত পরিকল্পনা কি?

অ্যাফিলিয়েট মার্কেটিং এর পাশাপাশি ভবিষ্যতে উদ্যোক্তা হতে চাই। নিজেকে একজন প্রথম সারির ব্যবসায়ী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চাই।

* সময় দেয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।

আপনাকে ও সি-নিউজের পাঠকদের ধন্যবাদ জানাচ্ছি।

 

-সিনিউজভয়েস